- - -

স্বকীয়তার জয়গান- আত্মমর্যাদা ও নিজের শর্তে বাঁচার দর্শন!!

fb img 1792992869800
Print News

স্বকীয়তার জয়গান- আত্মমর্যাদা ও নিজের শর্তে বাঁচার দর্শন!!

 

যতদিন বেঁচে থাকব, মাথা উঁচু করে নিজের শর্তে এবং নিজের স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখে বাঁচার এই যে অটল অঙ্গীকার, এটি কেবল কোনো আকস্মিক ভাবোচ্ছ্বাস বা আবেগপ্রবণ মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ নয়! বরং এটি মানব অস্তিত্বের গভীরতম দার্শনিক সত্য, মনস্তাত্ত্বিক আত্মমর্যাদা এবং সামাজিক শৃঙ্খল ভেঙে স্বাধীন স্বকীয়তা প্রতিষ্ঠার এক ঐতিহাসিক লড়াই। মানব ইতিহাসের সূচনা থেকেই সমাজ, সংস্কৃতি ও পারিপার্শ্বিক প্রথা প্রতিনিয়ত চেষ্টা করে এসেছে মানুষকে এক নির্দিষ্ট ছকে বাঁধতে, ব্যক্তির চিন্তা ও আকাঙ্ক্ষাকে সামাজিক যৌথতার স্বার্থে বা সমষ্টির প্রত্যাশার যাঁতাকলে পিষে মারতে।

সভ্যতার প্রতিটি বড় পরিবর্তন বা ব্যক্তিগত জীবনের প্রকৃত সফলতা এসেছে তখনই, যখন কোনো ব্যক্তি নিজের ভেতরের সৎ ও স্বাধীন কণ্ঠস্বরকে সমাজ নির্ধারিত অনুশাসনের চেয়ে ঊর্ধ্বে স্থান দিতে পেরেছে। সমাজবিজ্ঞানী ও মনস্তাত্ত্বিকদের মতে, যখন একজন মানুষ কেবল অন্যের চোখ দিয়ে নিজের জীবনের মূল্য পরিমাপ করতে শুরু করে এবং অন্যের অনুমোদন বা প্রশংসা পাওয়ার আশায় নিজের মৌলিক সত্তা ও ইচ্ছেগুলোকে বলির পাঁঠা বানায়, তখন সে এক গভীর ‘অনুকরণমূলক অস্তিত্বে’ নিমজ্জিত হয়, যা মানুষকে ধীরে ধীরে আত্মবিচ্ছিন্নতা এবং মানসিক শূন্যতার দিকে ঠেলে দেয়।

অন্যের প্রত্যাশা পূরণ করতে গিয়ে নিজের ভেতরের আত্মাকে মেরে ফেলে বেঁচে থাকা কোনো সার্থক জীবন হতে পারে না! সে বাঁচায় জীবনের কোনো মৌলিকত্ব থাকে না, থাকে কেবল সমাজের তৈরি করা স্ক্রিপ্টে নির্জীব অভিনয়ের বাধ্যবাধকতা। এর বিপরীতে নিজের শর্তে বাঁচার সংকল্পটি একটি মনস্তাত্ত্বিক ও নৈতিক অবস্থান, যা ব্যক্তিকে নিজের জীবনের মূল চালক হওয়ার শক্তি দেয় এবং এর ফলে সে নিজের প্রতিটি সিদ্ধান্তের ভালো-মন্দ পরিণতি পূর্ণাঙ্গ দায়িত্ব ও পূর্ণ মানসিক পরিপক্কতার সঙ্গে গ্রহণ করতে শেখে। মাথা উঁচু রাখার এই মানসিকতা কিন্তু অহংকার বা ঔদ্ধত্যের প্রতীক নয়, এটি হলো প্রহিত আত্মমর্যাদা ও এক অনমনীয় মেরুদণ্ড, যা জীবনের প্রতিকূল পরিস্থিতি, ব্যর্থতা কিংবা সাময়িক পরাজয়ের মুখেও মানুষকে নত হতে দেয় না এবং অন্যায় আপসের হাত থেকে বিবেককে রক্ষা করে। আধুনিক মনস্তত্ত্বের ভাষায়, একজন মানুষের মানসিক সুস্থতা ও জীবনতৃপ্তির অন্যতম মূল শর্ত হলো আত্ম-সততা বা অথেণ্টিসিটি, যার অর্থ হলো নিজের বিশ্বাস, অনুভূতি ও কার্যকলাপে কোনো কৃত্রিমতা না রাখা এবং নিজেকে যা বিশ্বাস করি ঠিক সেভাবেই প্রকাশ করা।

যখন কেউ অন্যের প্রত্যাশার বোঝা ঝেড়ে ফেলে নিজের মৌলিক সত্তাকে উন্মোচিত করতে পারে, তখন সে জীবনের এক পরম মুক্তি অনুভব করে, যেখানে লোকলজ্জার ভয় কিংবা সামাজিক অস্বীকৃতির আশঙ্কা তার চলার পথকে অবরুদ্ধ করতে পারে না। এই স্বতন্ত্র জীবনদর্শনের অর্থ সামাজিক দায়িত্ব এড়ানো বা স্বেচ্ছাচারী হয়ে ওঠা নয়, বরং নিজের স্বতন্ত্র সত্তাকে অটুট রেখে একটি অর্থপূর্ণ ও স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবন গড়ে তোলা, যেখানে প্রতিটি কর্মের প্রেরণা আসে ভেতর থেকে, বাহ্যিক কোনো প্ররোচনা বা স্বীকৃতির মহড়া থেকে নয়। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে সমাজ কাকে কতটা হাততালি দিল বা কে কতটা বাহবা পেল তা দিয়ে একজন মানুষের জীবনের সামগ্রিক মূল্য নির্ধারিত হয় না, বরং শেষ মুহূর্তে নিজের অন্তরাত্মার মুখোমুখি হয়ে শান্তিতে এটি বলতে পারাটাই সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জন যে, আমি কারও করুণা বা প্রত্যাশার দাস হয়ে বাঁচিনি, আমি বেঁচেছি আমার নিজের শর্তে, স্বকীয়তায় উজ্জ্বল হয়ে এবং পূর্ণ আত্মসম্মান নিয়ে, আর এই দৃঢ় সত্যবোধই মানুষের সমগ্র অস্তিত্বকে মহিমান্বিত ও অমর করে তোলে।

শাহিদা জাহান

Loading

Facebook
Twitter
LinkedIn
Su Mo Tu We Th Fr Sa