- - -

আমি অর্নবের মা

fb img 1792561498183
Print News

আমি কিছু মনে করিনি, করিও না

আমি অর্নবের মা

 

অর্নব একজন অটিজম বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন ব‍্যক্তি ।
অর্নব আমার প্রথম সন্তান
২১শে আগস্ট ,”২৬ ; ৩৭ বছর পূর্ণ হবে ।
“মা” নামে নতুন পরিচয় একজন নারীর
এ অনুভূতি সকল নারীরাই অনুভব করেন যারা মা হয়েছেন বা মা হবার অপেক্ষায় আছেন ।
আমার প্রত‍্যাশাও ছিল তেমনই !
মা হয়েছি প্রথমবার , কিন্তু প্রত‍্যাশা রয়ে গেছে অনেকটাই অপূর্ণ ।
একজন নারী “ মা” ডাক শোনার জন্য অপেক্ষা করে,
আমিও অপেক্ষায় ছিলাম, মা ডাক শুনিনি সঠিকভাবে ।
তাতে আমার এখন কোন কষ্ট নেই ।
অর্নব আমাকে শিখিয়েছে মা ডাক নাশুনেও চোখের অনুভূতি, এবং মুখের হাসি ও অভিব্যক্তি দিয়েও মাতৃত্বের স্বাদ পাওয়া যায়- যেটা স্বর্গীয় ।

সমাজের তিরস্কার- পাগল, পাপের ফসল ……. ইত্যাদি আমাকে এতটুকু কষ্ট দিতে পারেনি, পেলেও সেটা সাময়িক,
কারন অর্নব আমার আত্মজ, আমার প্রান ,
শিখিয়েছে কিভাবে সমাজের এসব কুসংস্কার দূর করতে কাজ করতে হয় , মায়ের দায়িত্ববোধ,সন্তানকে নিয়ে এ সমাজে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর ।
সমবয়সীরা অর্নবের সাথে মিশতে চাইতো না, মিশতে দিত না অনেক অভিভাবক।
আমি কিছু মনে করিনি, এটা তাঁদের কুসংস্কার,অজ্ঞতা ।

অটিজম কোন ছোঁয়াছে বা অশপৃশ‍্য রোগ নয় , স্নায়বিক বিকাশের প্রতিবন্ধকতা মাত্র।
অনেক সময় নিকটজনদেরকেউ কেউ নিমন্ত্রণ করতো অর্নবকে বাদ দিয়ে ,( যদি অর্নবকে দেখে বিয়ে ভেঙে যায় হয়তো)।
আমি কিছু মনে করিনি, যদিও সাময়িক কষ্ট পেয়েছি ।
এটাও সমাজের কুসংস্কার ।

অনেক অনেক নির্ঘুম রাত কাটিয়েছি অর্নবকে নিয়ে,
নির্ঘুম রাতের , কষ্টের রাতের পর কোন আগত অতিথির সাথে হয়তো কষ্ট লুকিয়ে অভিনয় করতে পারিনি বলে আমাকে অপবাদ দিতে এতটুকু পিছপা হয়নি অনেক সময় অনেকেই ঘরেও , প্রফেশনাল জায়গায় ও ।
চাহিদামত হাসিমুখে হয়তো কথা বলতে পারিনি কষ্ট লুকিয়ে ।
আমি লজ্জিত , ক্ষমা প্রার্থনা করি যারা আমার বিরুপ আচরণে কষ্ট পেয়েছেন ।
আমি অর্নবের মা , আমার কোন কষ্ট থাকা উচিৎ নয়!!!সমাজের কারো কাছে এ কষ্টের বহিঃপ্রকাশ করা উচিত নয় !!।

নির্ঘুম রাত , তারপর চাকুরী করে ঘরে এসে পরিবারের কোন বয়োজ‍্যষ্ট সদস্যের সাথে গল্প গুজব করিনি বলে আমাকে অনেক অপবাদ দিয়েছে অনেকে !!!!
আমি কিছু মনে করিনি ,
আমি অর্নবের মা, অর্নবকে যে আমি জন্ম দিয়েছি,সবকিছুই আমাকেই সহ‍্য করতে হবে ।
অর্নবের জন‍্য হয়তো কোনদিন কোন আমন্ত্রণ রক্ষা করতে পারিনি বলে , অনেক কথা শুনতে হয়েছে ।
আমি কিছু মনে করিনি , অর্নব আমার প্রায়রিটি ।

কোন কোন অভিভাবক ভালো করে হেসে হেসে কথা বলিনি বলে কোন একদিন আমাকে তিরস্কার করতে ভূল করেনি ।
আবার এটাও শুনতে হয়েছে “ আপনার একটা সন্তান নাকি প্রতিবন্ধী- এত হাসিখুশি থাকেন কি করে “?
এক আত্মীয় তার দুসন্তান নিয়ে প্রায়ই চিকিৎসা নিতে আসতো, কোন সিরিয়াল নিতে হয়নি কোন দিন বা ফী নেই নি কোনদিন।
একদিন বাচ্চাদের দেখিয়ে যাবার সময় বললো , পয়সা কত কামাবেন , বেড়াতে পারেন না !!
আমি কিছু মনে করিনি , উনি / উনারাতো জানেন না আমার কষ্টের কথা, অর্নব কে অটিজম থেকে উত্তরনের প্রচেষ্টার কথা।
আমার অর্নবের মত সন্তান তো উনাদের নেই।
আমারই অজ্ঞতা , কারো কাছেই কোনভাবেই নিজের কষ্টের বহিঃপ্রকাশ করতে নেই ।
আমি একজন গর্বিত “মা” এখন এরকমই আমার অনুভূতি – অর্নবের মা বলে ।
অর্নব আমাকে শিখিয়েছে কিভাবে পরিবারে সমাজে অর্নবদের নিয়ে চলতে হয় ।
সমাজের সকল কুসংস্কার দূর করে মাথা উঁচু করে বাঁচতে হয় ।
সকল অনুভূতির প্রকাশ সকল সময় করতে নেই ।
আমার কষ্ট আমারই , এটা কারো সাথে শেয়ার করতে নেই ।
আমাকে অনেক কিছুই শিখিয়েছে অর্নব , বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানের প্রতি আমার দায়িত্ব ও কর্তব্য ।
অর্নবের জন্য, অর্নবের মত অন‍্যদের জন‍্য অনুপ্রাণিত হয়ে কাজ করতে গিয়েও অনেক তিক্ত কথা শুনেছি, অনেক ধরনের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি ।

আমি কিছু মনে করিনি, আমি কিছু পাবার জন‍্য কোন কাজ করিনি , করিও না ।
আমার পরিচয় আমি অর্নবের মা
এবং আমার প্রফেশন- শিশুস্বাস্হ‍্য বিশেষজ্ঞ ।
অর্নব আমার প্রান , এখন আমাদের পরিবারের সকলের প্রিয়জন ।
শুধু চিন্তা আগামীর পথ চলা নিয়ে, আমি যখন থাকবো না তখন এখন যেমন আছে পরিবারে সেরকভাবেই থাকবে তো !!!
পরম করুনাময় সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করি সেরকমই থাকতে পারবে কারন আমার দ্বিতীয় সন্তান ( অর্নবের ছোট ভাই) আমারই সন্তান যে আমার মাতৃত্বের স্বাদ সবটুকুই পূর্ণ করেছে, যার মধ্যে আমি আমার প্রতিচ্ছবি দেখতে পাই ।
।
আসুন সবাই মিলে সমাজের কুসংস্কার দূর করি, একটা সমন্বিত সমাজ কাঠামো গড়ে তুলি ।
আজকে এসব অভিজ্ঞতার প্রকাশ কারো কাছ থেকে কোন করুনা পাবার জন‍্য নয় ,
যাঁদের ঘরে অর্নবের মত সন্তান নেই তাঁরা কখনই এ কষ্টগুলো বুঝতে পারবেন না ।
অটিজম বৈশিষ্ট্য সম্পন্নরা ছিল , আছে , থাকবে এ সমাজে ।
পরিবারে, সমাজে তাদের জন্য অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি জরুরি ।
আমার মত মায়েদের কষ্ট বোঝার ক্ষমতা কারো নেই ।
যে আত্মীয়ের সাথে হেসে হেসে কথা বলিনি বলে আমার মত মায়েদের নিগৃহীত হতে হয়, সেসব আত্মীয়- স্বজন , এক দিন নয় , কয়েকঘন্টার জন‍্যও হয়তো আপনার সন্তানের দায়িত্ব নেবেনা এটা আমার অভিজ্ঞতা বলে , যদি কেউ সেটা করা তাঁরা মহান ।
করুনা নয় সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিন , সহযোগিতা করতে না পারলে হেয় করবেন না ।
আমাদের এসব বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন সন্তান সৃষ্টি কর্তার পাঠানো বিশেষ উপহার ।
আজকের দিনে আমার প্রার্থনা এসব দেব সন্তানরা যেন কোনদিন অযত্নে , অবহেলায় নিগৃহীত না হয় ।
( এ লেখা কারো কাছ থেকে কোনো ভালো কমেন্ট বা বাহবাপাবার জন‍্য নয়, শুধু একজন বিশেষ চাহিদাসমপন্ন সন্তানের মাকে কিভাবে মানসিক চাপ সহ‍্য করে দিনাতিপাত করতে হয় সেটা বলার চেষ্টা, সমাজ পরিবর্তনের জন‍্য প্রচেষ্টা, কারন SDG বলে- “No One Left Behind “
সকল মায়েদের মানসিক স্বাস্থ্যের উপর জোর দেওয়া উচিত যাঁদের অর্নবের মত সন্তান আছে ।

ডা. বাসনা মুহুরী
শিশুস্বাস্হ‍্য বিশেষজ্ঞ
অর্নবের মা
১৯/০৮/২৬

Loading

Facebook
Twitter
LinkedIn
Su Mo Tu We Th Fr Sa