
রাউজানের কোয়েপাড়া গ্রামের গর্বিত সন্তান ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী
বাংলাদেশের চিকিৎসাসেবা, জনস্বাস্থ্য উন্নয়ন, মহান মুক্তিযুদ্ধ ও মানবকল্যাণে যাঁরা অসামান্য অবদান রেখেছেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম বীর মুক্তিযোদ্ধা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। তিনি ছিলেন একজন খ্যাতনামা চিকিৎসক, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, সমাজসেবক ও মানবাধিকারকর্মী। চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার কোয়েপাড়া গ্রামে জন্ম নেওয়া এই গুণী ব্যক্তিত্ব সারা জীবন সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যসেবা ও অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করেছেন।
১. জন্ম ও পারিবারিক পরিচয়
ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী ১৯৪১ সালের ২৭ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম জেলার রাউজান উপজেলার কর্ণফুলী নদীর তীরবর্তী কোয়েপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম হুমায়ুন মোর্শেদ চৌধুরী এবং মাতার নাম হাছিনা বেগম চৌধুরী। তাঁর বাবা পুলিশ কর্মকর্তা ছিলেন এবং মা ছিলেন গৃহিণী। দশ ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড়।
শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন সচেতন, সাহসী ও সমাজের প্রতি দায়বদ্ধ একজন মানুষ। পরবর্তী জীবনে মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং সাধারণ মানুষের কল্যাণে তাঁর যে দৃঢ় অবস্থান দেখা যায়, তা তাঁকে দেশের একজন আলোচিত ব্যক্তিত্বে পরিণত করে।
২. শিক্ষাজীবন-
ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর শিক্ষাজীবন শুরু হয় ঢাকায়। তিনি পুরান ঢাকার বকশীবাজারের নবকুমার ইনস্টিটিউশন থেকে স্কুলের পড়াশোনা শেষ করেন। এরপর ঢাকা কলেজে পড়াশোনা করেন এবং পরবর্তীতে ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন।১৯৬৪ সালে তিনি চিকিৎসাবিদ্যায় এমবিবিএস ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে উচ্চতর চিকিৎসাশিক্ষা ও প্রশিক্ষণের জন্য যুক্তরাজ্যে যান এবং রয়্যাল কলেজ অব সার্জনসে এফআরসিএস প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। চিকিৎসাশাস্ত্রে উচ্চশিক্ষা অর্জনের পাশাপাশি ছাত্রজীবন থেকেই তিনি সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ছিলে
৩. মহান মুক্তিযুদ্ধে অবদান-
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি বিদেশে উচ্চতর চিকিৎসাশিক্ষা গ্রহণের সুযোগ ছেড়ে দেশের স্বাধীনতার পক্ষে কাজ করার সিদ্ধান্ত নেন। ভারতের ত্রিপুরায় যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসার জন্য বাংলাদেশ ফিল্ড হাসপাতাল প্রতিষ্ঠায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
যুদ্ধের সময় আহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা ছিল অত্যন্ত কঠিন কাজ। সীমিত চিকিৎসাসামগ্রী ও জনবল নিয়ে এই হাসপাতাল মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
হাসপাতালে প্রশিক্ষিত নার্সের সংকট মোকাবিলায় অল্প সময়ের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নারী স্বেচ্ছাসেবীদের স্বাস্থ্যসেবার কাজে যুক্ত করার উদ্যোগও ছিল উল্লেখযোগ্য। এর মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করেন, যথাযথ প্রশিক্ষণ ও উদ্যোগ থাকলে সীমিত সম্পদ দিয়েও মানুষের পাশে দাঁড়ানো সম্ভব।
৪. গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা-
স্বাধীনতার পর দেশের সাধারণ মানুষের কাছে সহজলভ্য স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী কাজ শুরু করেন।
১৯৭২ সালে তিনি গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন। এই প্রতিষ্ঠান গ্রামীণ জনগোষ্ঠী, দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
তাঁর চিন্তার অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল—চিকিৎসাসেবা যেন শুধু বিত্তবানদের জন্য সীমাবদ্ধ না থাকে; বরং প্রত্যন্ত গ্রামের সাধারণ মানুষও যেন সহজে চিকিৎসা পায়।প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, স্বাস্থ্যকর্মী প্রশিক্ষণ, নারী স্বাস্থ্যকর্মীদের অংশগ্রহণ এবং স্বল্পমূল্যে চিকিৎসাসেবা প্রদানের ক্ষেত্রে তাঁর উদ্যোগ বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করে।
৫. বাংলাদেশের ওষুধশিল্পে অবদান-
বাংলাদেশের ওষুধশিল্পের বিকাশ এবং সাধারণ মানুষের কাছে সাশ্রয়ী মূল্যে ওষুধ পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রেও ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে।১৯৮২ সালের জাতীয় ওষুধনীতি প্রণয়নে তিনি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এই নীতির লক্ষ্য ছিল দেশের ওষুধশিল্পকে শক্তিশালী করা, প্রয়োজনীয় ওষুধের প্রাপ্যতা বাড়ানো এবং ওষুধের মান ও ব্যবহারকে জনস্বাস্থ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা।দেশীয় ওষুধশিল্পের বিকাশে এই নীতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। সাধারণ মানুষের চিকিৎসাব্যয় কমানো এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ সহজলভ্য করার বিষয়ে তিনি বরাবরই সোচ্চার ছিলেন।
৬. মানবসেবা ও জনস্বাস্থ্য নিয়ে চিন্তা-
ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বিশ্বাস করতেন, সুস্থভাবে বেঁচে থাকা মানুষের মৌলিক অধিকার। অর্থের অভাবে কেউ যেন চিকিৎসাবঞ্চিত না হয়, সেই লক্ষ্য নিয়ে তিনি কাজ করেছেন।তাঁর উদ্যোগে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের বিভিন্ন স্বাস্থ্যসেবামূলক কার্যক্রম গড়ে ওঠে। পাশাপাশি স্বল্পমূল্যে কিডনি ডায়ালাইসিসের ব্যবস্থা করার উদ্যোগও ছিল তাঁর কাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।তিনি শুধু চিকিৎসক হিসেবেই পরিচিত ছিলেন না; জনস্বাস্থ্য, মানবাধিকার, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং সাধারণ মানুষের অধিকার নিয়েও কথা বলতেন। তাঁর কর্মজীবন ছিল মানুষের কল্যাণে নিজের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর এক দীর্ঘ প্রচেষ্টা।
৭. পুরস্কার ও সম্মাননা-
মানবসেবা, জনস্বাস্থ্য এবং সমাজকল্যাণে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কার ও সম্মাননা লাভ করেন। উল্লেখযোগ্য সম্মাননাগুলোর মধ্যে রয়েছে—
স্বাধীনতা পুরস্কার: ১৯৭৭ সালে।
র্যামন ম্যাগসাইসাই পুরস্কার: ১৯৮৫ সালে।
রাইট লাইভলিহুড অ্যাওয়ার্ড: ১৯৯২ সালে।
ডক্টর অব হিউম্যানিটেরিয়ান সম্মাননা: ২০০৯ সালে।ইন্টারন্যাশনাল পাবলিক হেলথ হিরোজ অ্যাওয়ার্ড: ২০১০ সালে।
এসব সম্মাননা তাঁর কর্মজীবনের বিভিন্ন দিক এবং জনস্বাস্থ্যের উন্নয়নে তাঁর অবদানের স্বীকৃতি বহন করে।
৮. মৃত্যু ও চিরস্মরণীয় অবদান-
২০২৩ সালের ১১ এপ্রিল ঢাকার গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮১ বছর।তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের চিকিৎসা, জনস্বাস্থ্য ও সমাজসেবার জগতে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের অবসান ঘটে। তবে তাঁর প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যসেবার ধারণা এবং সাধারণ মানুষের জন্য কাজ করার আদর্শ আজও স্মরণীয় হয়ে রয়েছে।
৯. রাউজানের গর্ব, বাংলাদেশের গর্ব-
চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার কোয়েপাড়া গ্রামের সন্তান ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর জীবন আমাদের শেখায়, একজন মানুষ তাঁর কর্মের মাধ্যমে কীভাবে দেশের সীমানা পেরিয়ে মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিতে পারেন।রাউজানের মাটি জন্ম দিয়েছে বহু গুণী ও কৃতী ব্যক্তিত্বকে। তাঁদের মধ্যে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী এমন একজন মানুষ, যাঁর জীবনকর্ম শুধু রাউজানবাসীর জন্য নয়, সমগ্র বাংলাদেশের মানুষের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস।
তিনি দেখিয়েছেন, প্রকৃত সাফল্য শুধু ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠা অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং মানুষের দুঃখ-কষ্ট লাঘব করা, অসহায়ের পাশে দাঁড়ানো এবং সমাজের ইতিবাচক পরিবর্তনে অবদান রাখার মধ্যেই জীবনের প্রকৃত সার্থকতা নিহিত।
কোয়েপাড়া গ্রামের এই কৃতী সন্তান তাঁর কর্ম, সাহস, মানবিকতা ও জনসেবার আদর্শের মধ্য দিয়ে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।
ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী—রাউজানের গর্ব, বাংলাদেশের গর্ব; গণমানুষের স্বাস্থ্যসেবায় নিবেদিত এক স্মরণীয় ব্যক্তিত্ব।
![]()









