
মাইনীমুখ বাজারে দখলের থাবা, ফায়ার রোড উধাও-নীরব বাজার ফান্ড!
২৫টি ফায়ার রোডের অনেকগুলোই দখলে থাকার অভিযোগ, অগ্নিকাণ্ডে বাড়ছে ঝুঁকি,হাটের দিনে দুর্ভোগে ক্রেতা-বিক্রেতারা
পাহাড়ের বুকে গড়ে ওঠা ঐতিহ্যবাহী মাইনীমুখ বাজার। স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র এই বাজার এখন অস্তিত্বের সংকটে না পড়লেও হারাতে বসেছে তার স্বাভাবিক পরিবেশ ও স্বকীয়তা। অভিযোগ উঠেছে, প্রভাবশালীদের দখলে সংকুচিত হচ্ছে বাজার ফান্ডের জায়গা, একের পর এক বেদখল হচ্ছে অগ্নিনির্বাপণের জন্য নির্ধারিত ফায়ার রোড। কোথাও গড়ে উঠেছে স্থাপনা, কোথাও সংকীর্ণ হয়ে পড়েছে চলাচলের পথ। ফলে একদিকে হাটের দিনে ক্রেতা-বিক্রেতাদের দুর্ভোগ বাড়ছে, অন্যদিকে অগ্নিকাণ্ডের মতো জরুরি পরিস্থিতিতে ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
রাঙামাটির লংগদু উপজেলার মাইনীমুখ বাজারের বিভিন্ন স্থানে ফায়ার রোড দখলের এমন চিত্র স্থানীয়দের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। সরেজমিনে বাজারের কয়েকটি স্থানে ফায়ার রোডের জায়গায় স্থাপনা নির্মাণ ও চলাচলের পথ সংকুচিত হওয়ার চিত্র দেখা গেছে। বিশেষ করে প্রতি শনিবার সাপ্তাহিক হাট বসলে মানুষের ভিড়, পণ্য পরিবহন ও যানবাহনের চাপে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। জরুরি প্রয়োজনে দ্রুত চলাচলের জন্য নির্ধারিত পথই যদি দখলে থাকে, তাহলে অগ্নিকাণ্ডের সময় ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ও কর্মীদের নির্বিঘ্নে ঘটনাস্থলে পৌঁছানো নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
শুধু জায়গা দখল নয়, এসব অনিয়মের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে অশোভন আচরণের অভিযোগও উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাব খাটিয়ে বাজারের অনিয়ম নিয়ে প্রশ্ন তোলার পরিবেশ বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করছেন কেউ কেউ। এতে জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো সামনে আনা কঠিন হয়ে পড়ছে বলে মনে করছেন তাঁরা।
বাজারের ফায়ার রোড ও বাজার ফান্ডের জায়গা দখলের অভিযোগ দীর্ঘদিনের হলেও কার্যকর উচ্ছেদ এবং নিয়মিত তদারকির দৃশ্যমান উদ্যোগ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ক্রেতা-বিক্রেতারা। তাঁদের ভাষ্য, বাজারের শৃঙ্খলা রক্ষা ও অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব যাঁদের, তাঁদের আরও সক্রিয় হওয়া প্রয়োজন।
২৫টি ফায়ার রোড, অনেকগুলোই দখলের অভিযোগ
মাইনীমুখ বাজারের চৌধুরী দেব কুমার চাকমার ভাষ্য, বাজার ফান্ডের আওতায় মোট ২৫টি ফায়ার রোড রয়েছে। কিন্তু দখলের কারণে সেগুলোর অনেকগুলোই প্রায় বিলুপ্তির পথে। কাঁচাবাজারের পূর্ব পাশ, রুটি ঘাট, মধ্যবাজারে করিম স্টোরের পাশ এবং গরুর বাজারের উত্তর পাশসহ বিভিন্ন স্থানে ফায়ার রোড দখল হয়ে গেছে বলে জানান তিনি। এসব অবৈধ স্থাপনা দ্রুত অপসারণের উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও জানিয়েছেন বাজার চৌধুরী।
অন্যদিকে, বাজার কমিটির সভাপতি আবুল কাশেম বলেন, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নির্দেশনা অনুযায়ী অবৈধ স্থাপনাগুলো উচ্ছেদের কথা রয়েছে। তবে তাঁর নিজের দোকানের পাশের ফায়ার রোড দখলের অভিযোগ সম্পর্কে তিনি কোনো বক্তব্য দেননি।
এ বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করতে গেলে বাজার কমিটির সভাপতির ছেলে ও ভাইয়ের বিরুদ্ধে সাংবাদিকদের সঙ্গে অশোভন আচরণের অভিযোগ উঠেছে। জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে এমন আচরণ গণমাধ্যমের স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিবেশ নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করেছে।
আগুন লাগলে বিপদ বাড়াবে দখল
বাজারের ফায়ার রোড দখলের বিষয়টি কেবল চলাচলের প্রতিবন্ধকতা নয়, এটি অগ্নিনিরাপত্তার জন্যও বড় উদ্বেগের কারণ। লংগদু ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তা হেলাল উদ্দীন বলেন, মাইনী বাজারে ইতিমধ্যে বেশ কয়েকবার অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। অবৈধ দখলের কারণে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের দুর্ঘটনাস্থলে দ্রুত পৌঁছাতে সমস্যা হয়। এতে আগুন নিয়ন্ত্রণে বিলম্বের পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা থাকে।
তিনি আরও বলেন, বাজার ফান্ড কর্তৃপক্ষ দ্রুত অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করলে ফায়ার সার্ভিসের কার্যক্রম সহজ হবে এবং বাজারের ব্যবসায়ীসহ সবার জন্যই তা উপকারী হবে।
ফায়ার সার্ভিসের এই বক্তব্য বাজারের ফায়ার রোড দখলের বিষয়টিকে আরও গুরুত্বের সঙ্গে দেখার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে। কারণ, আগুন লাগার পর প্রতিটি মুহূর্ত গুরুত্বপূর্ণ। সে সময় চলাচলের পথ দখলমুক্ত না থাকলে আগুন নিয়ন্ত্রণে বিলম্ব হতে পারে, ছড়িয়ে পড়তে পারে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা।
দখলমুক্ত বাজার চান ক্রেতা-বিক্রেতারা
স্থানীয় ক্রেতা-বিক্রেতাদের দাবি, মাইনীমুখ বাজারের ফায়ার রোড ও বাজার ফান্ডের জায়গা দখলমুক্ত করতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। একই সঙ্গে নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করতে হবে, যাতে উচ্ছেদের পর আবারও কেউ এসব জায়গা দখল করতে না পারে। বিশেষ করে সাপ্তাহিক হাটের দিনে নির্বিঘ্নে চলাচল এবং জরুরি সেবার যানবাহন প্রবেশের উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছেন তাঁরা।
স্থানীয়দের মতে, ঐতিহ্যবাহী একটি বাজারের সৌন্দর্য ও সুনাম শুধু দোকানপাট কিংবা বেচাকেনার ওপর নির্ভর করে না,এর সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনা, নিরাপদ চলাচল এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার সক্ষমতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। অথচ ফায়ার রোড দখলের অভিযোগ বাস্তবায়িত হলে বাজারের অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ার আশঙ্কা থেকেই যায়।
এ অবস্থায় বাজার ফান্ড কর্তৃপক্ষের সরেজমিন পরিদর্শন, দখল হওয়া জায়গার সীমানা নির্ধারণ এবং আইনানুগভাবে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। পাশাপাশি উপজেলা প্রশাসনের কার্যকর তদারকি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।
মাইনীমুখ বাজারের ফায়ার রোডগুলো কি শেষ পর্যন্ত দখলমুক্ত হবে, নাকি অব্যাহত দখলে আরও সংকুচিত হবে জরুরি চলাচলের পথ।এ প্রশ্ন এখন স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের। ঐতিহ্যবাহী বাজারটির স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনা এবং অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি কমাতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত, দৃশ্যমান ও কার্যকর পদক্ষেপের অপেক্ষায় রয়েছেন তাঁরা।
![]()









