- - -

আব্দুস সামাদ আজাদ জন্ম ও প্রাথমিক জীবন

আব্দুস সামাদ আজাদ
জন্ম ও প্রাথমিক জীবন

১৯২২ সালের ১৫ জানুয়ারি সুনামগঞ্জ জেলার জগন্নাথপুর উপজেলার ভুরাখালী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন আব্দুস সামাদ । অজপাড়াগাঁয়ের এই ছেলেটির জীবনে রাজনীতির সূচনা হয় একেবারে স্কুল জীবন থেকেই। ১৯৪০ সালে সামাদ আজাদ সুনামগঞ্জ মহকুমা মুসলিম ছাত্র ফেডারেশনের সভাপতি হিসাবে ছাত্র রাজনীতিতে পদার্পণ করেন , যখন তিনি মাত্র সপ্তম শ্রেণীর ছাত্র ছিলেন। এরপর থেকে শুরু হয় তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন যা বাংলাদেশের ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছে।

১৯৪৮ সালে আবদুস সামাদ আজাদ সিলেট এমসি কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন এবং এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি হন । কিন্তু সরকারবিরোধী রাজনীতিতে সক্রিয় থাকার কারণে তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার তাঁর মাস্টার্স পরীক্ষা দিতে দেয়নি এবং এম এ ডিগ্রি কেড়ে নেয়। এ থেকেই বোঝা যায় তিনি কতটা আপসহীন এবং নীতিনিষ্ঠ ছিলেন।

ভাষা আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা
বাংলাদেশের ইতিহাসে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন একটি মাইলফলক এবং সেই আন্দোলনে আব্দুস সামাদ আজাদের ভূমিকা অবিস্মরণীয়। ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের সময় সক্রিয়ভাবে অংশ গ্রহণ করতে গিয়ে কারা বরণ করেন ।
১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারিতে ১৪৤ ধারার মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় দশ হাজারের মতো ছাত্র জড়ো হলে আওয়ামী মুসলিম লীগ নেতা শামসুল হক ১৪৪ ধারা না ভাঙার পক্ষে বক্তব্য দেন এবং ছাত্ররা প্রতিবাদী হয়ে ওঠেন । এই সংকটময় মুহূর্তে আবদুস সামাদ অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে পরিস্থিতি সামাল দিয়ে ছাত্রদের ১৪৪ ধারা ভাঙার পথে নিয়ে যান। তিনি বলেছিলেন, চারজনের বেশি হলে ১৪৪ ধারা ভাঙার অভিযোগ হবে, তাই ছোট দলে বিভক্ত হয়ে মিছিল করতে হবে। এবং এভাবেই স্বেচ্ছায় গ্রেপ্তার হওয়ার দ্বিতীয় মিছিলেই ছিলেন আবদুস সামাদ।

রাজনৈতিক জীবনের নানা বাঁক
আব্দুস সামাদ আজাদের রাজনৈতিক জীবন ছিল বৈচিত্র্যময় এবং সংগ্রামে ভরা। ১৯৫৩ সালে তৎকালিন পূর্ব পাকিস্তান যুব লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন এবং ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের মনোনীত প্রার্থী হিসাবে তৎকালীন প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়ে রাজনীতিতে আসেন । এরপর তিনি আওয়ামী লীগের শ্রম সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৫৭ সালের জুলাই মাসে আদর্শগত কারণে আওয়ামী লীগ বিভক্ত হলে তিনি মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে কৃষক শ্রমিক পার্টিতে যোগ দেন । কিন্তু ১৯৬৯ সালে আবার আওয়ামী লীগে ফিরে আসেন এবং সিলেট জেলা শাখার সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খানের সামরিক শাসন জারীর পর তিনি আবার গ্রেফতার হন এবং ৪ বছর কারাভোগ করে ১৯৬২ সালে মুক্তিলাভ করেন । এভাবে বারবার কারাবরণ করেছেন দেশ ও জনগণের স্বার্থে।

মুক্তিযুদ্ধে অবদান
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে আব্দুস সামাদ আজাদের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে আবদুস সামাদ আজাদ মুজিবনগরস্থ প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের অন্যতম সংগঠক ছিলেন এবং শুরুতে মুজিবনগর সরকারের রাজনৈতিক উপদেষ্টা এবং ভ্রাম্যমান রাষ্ট্রদূত হিসেবে কাজ করেন । ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে সামাদ আজাদ বাংলাদেশের প্রথম পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্বপান ।
মুক্তিযুদ্ধের সময় একটি বিশেষ ঘটনা উল্লেখযোগ্য। খোন্দকার মোশতাক যখন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে পাকিস্তানের সঙ্গে কনফেডারেশনের চেষ্টা করছিলেন, সেই সংকটকালে আবদুস সামাদ বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। এই সময়েই তিনি নিজের নামের সঙ্গে ‘আজাদ’ শব্দটি যোগ করেন এবং সেই থেকে আমৃত্যু ‘আব্দুস সামাদ আজাদ’ নামে পরিচিত হন।
১৯৭১ সালের হাঙ্গেরি বুদাপেস্টে বিশ্বশান্তি সম্মেলনে বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন এবং বিশ্ববর্ণবৈষম্যকমিটির চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন । এভাবে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের পক্ষে জনমত সৃষ্টিতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

স্বাধীন বাংলাদেশে রাজনৈতিক জীবন
স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারে তাঁকে কৃষি মন্ত্রী নিয়োগ করা হয়। ১৯৭৩ সালের সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের মনোনয়নে তিনি সুনামগঞ্জ জেলার দুটি আসনে নির্বাচন করে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন ।
১৯৭৫ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর তাঁকে গ্রেফতার করা হয় এবং ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত তিনি কারান্তরীণ থাকেন। কিন্তু এই বিপর্যয়ের পরেও তিনি হাল ছাড়েননি। ৭৫ পরবর্তী আওয়ামী লীগের পুনর্গঠনে বিশেষ ভূমিকা পালন করেন এবং জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আওয়ামী লীগের অন্যতম প্রেসিডিয়াম সদস্য ছিলেন ।
১৯৯০ এর গণঅভ্যুত্থানের এবং ১৯৯৬ এর জনতার মঞ্চের অন্যতম রূপকার ছিলেন তিনি এবং ১৯৯১ সালে বিরোধী দলীয় উপনেতার দায়িত্ব পালন করেন । স্বৈরাচার এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে তাঁর ভূমিকা ছিল অগ্রণী। তিন জোটের রূপরেখা প্রণয়ন ও বিরোধী দলগুলোর জোটবদ্ধ আন্দোলন পরিচালনায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ মন্ত্রিসভায় সফল পররাষ্ট্র মন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন এবং সর্বশেষ ২০০১ সালের নির্বাচনে সুনামগঞ্জ-৩ আসন থেকে নির্বাচিত হন । পররাষ্ট্র মন্ত্রী হিসেবে তিনি বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষায় এবং বিভিন্ন দ্বিপক্ষীয় চুক্তি সম্পাদনে দক্ষতার পরিচয় দেন।

ব্যক্তিত্ব ও রাজনৈতিক দর্শন
আবদুস সামাদ আজাদ যে রাজনীতি করেছেন সেটার মূল উদ্দেশ্য ছিল দেশ ও মানুষের কল্যাণ এবং জীবনভর মানুষের কল্যাণে কাজ করেছেন এই নির্লোভ রাজনীতিক । তিনি ছিলেন অত্যন্ত সদালাপী এবং সাধারণ জীবনযাপনে অভ্যস্ত একজন মানুষ।
আব্দুস সামাদ আজাদের পুরো জীবনটাই সংগ্রামমুখর। দলের ভেতর, বাইরে নানা ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করে তাঁকে এগিয়ে যেতে হয়েছে গভীর আত্মপ্রত্যয়ে। বিরোধী দলের নেতাদের সঙ্গে তাঁর ছিল হৃদ্যতা ও আন্তরিকতা । দল-মত নির্বিশেষে সকল শ্রেণী-পেশার মানুষের সঙ্গে তাঁর ছিল গভীর সম্পর্ক। রাজনীতির ধ্যানজ্ঞান এই জননেতা গভীর রাত পর্যন্ত কর্মীদের সঙ্গে আড্ডা দিতেন।
অত্যন্ত ধর্মপরায়ণ হয়েও তিনি ছিলেন একজন অসাম্প্রদায়িক ও প্রগতিশীল মানুষ। ১৯৬৪ সালে পাকিস্তান সরকার কর্তৃক সৃষ্ট ষড়যন্ত্রমূলক সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সাহসিকতার সাথে মোকাবিলা করতে গিয়ে কারারূদ্ধ হন । এ থেকে বোঝা যায় সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান কতটা দৃঢ় ছিল।

উপসংহার
২০০৫ সালের ২৭ এপ্রিল তিনি মারা যান , কিন্তু রেখে যান এক সমৃদ্ধ রাজনৈতিক উত্তরাধিকার। ভাটির মাটি থেকে উঠে আসা এই মানুষটি হয়ে উঠেছিলেন রাজনৈতিক মহীরুহ। ষাট বছরের রাজনৈতিক জীবনে তিনি দেখেছেন তিন পতাকা – ব্রিটিশ, পাকিস্তান এবং স্বাধীন বাংলাদেশ। প্রতিটি যুগেই তিনি ছিলেন জনগণের পক্ষে, গণতন্ত্রের পক্ষে।
আব্দুস সামাদ আজাদ শুধু একজন রাজনীতিবিদ ছিলেন না, তিনি ছিলেন এক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশের প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে তাঁর ছিল সক্রিয় উপস্থিতি। ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ, স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন থেকে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা – সর্বত্র তিনি রেখেছেন অমোচনীয় স্বাক্ষর। তাঁর জীবন বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও গণতন্ত্রের ইতিহাসের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত।

আজকের প্রজন্মের কাছে আব্দুস সামাদ আজাদ নাম ও তার কর্মময় জীবন অনুপ্রেরণা হয়ে থাকুক। তাঁর নীতিনিষ্ঠা, আপসহীন মনোভাব, দেশপ্রেম এবং জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা আজও প্রাসঙ্গিক। তিনি প্রমাণ করে গেছেন যে, সৎ রাজনীতি এবং জনসেবার মাধ্যমে একজন সাধারণ গ্রামের ছেলেও হতে পারে জাতির অন্যতম শ্রেষ্ঠ সন্তান। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে আব্দুস সামাদ আজাদ চিরকাল একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে থাকবেন।

Loading

Facebook
Twitter
LinkedIn

শিবগঞ্জ সীমান্তে ৫৯ বিজিবি’র অভিযান ফেন্সিডিল ও মোটরসাইকেল জব্দ মাহিদুল ইসলাম ফরহাদ ​চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ সীমান্তে মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান থেকে পৃথক দুটি অভিযান চালিয়েছে মহানন্দা ব্যাটালিয়ন (৫৯ বিজিবি)। এসব অভিযানে ৫০ বোতল ফেন্সিডিল ও একটি চোরাই মোটরসাইকেল জব্দ করা হয়েছে।​বিজিবি সূত্রে জানা যায়, সীমান্ত এলাকায় চোরাচালান ও মাদকবিরোধী চলমান অভিযানের অংশ হিসেবে ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে এই দুটি অভিযান পরিচালিত হয়। ​প্রথম অভিযান (চকপাড়া বিওপি): সুনির্দিষ্ট গোপন সংবাদের ভিত্তিতে সকাল ০৬:৫০ মিনিটে চকপাড়া বিওপির একটি বিশেষ টহল দল শিবগঞ্জ উপজেলার শাহবাজপুর ইউনিয়নের নামোচকপাড়া গ্রামে (সীমান্ত পিলার ১৮৩/৩-এস হতে আনুমানিক ৩০০ গজ বাংলাদেশের অভ্যন্তরে) অভিযান পরিচালনা করে। এ সময় বিজিবির উপস্থিতি টের পেয়ে এক মোটরসাইকেল আরোহী পালিয়ে গেলেও মালিকবিহীন ১টি মোটরসাইকেল আটক করা হয়।​দ্বিতীয় অভিযান (আজমতপুর বিওপি): একই দিন সকাল ০৮:৫০ মিনিটে আজমতপুর বিওপির আরেকটি বিশেষ টহল দল শাহবাজপুর ইউনিয়নের উপচকপাড়া গ্রামস্থ পাকা রাস্তায় (সীমান্ত পিলার ১৮২/২-এস হতে আনুমানিক ৮০০ গজ অভ্যন্তরে) অভিযান চালায়। এই অভিযানে মালিকবিহীন অবস্থায় ৫০ বোতল ফেন্সিডিল জব্দ করা হয়। ​উভয় অভিযানে জব্দকৃত মাদকদ্রব্য ও মোটরসাইকেলের আনুমানিক বাজার মূল্য ১,৪০,০০০ (এক লক্ষ চল্লিশ হাজার) টাকা। জব্দকৃত মালামালের বিষয়ে আইনগত কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলে জানিয়েছে বিজিবি। ​ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে মহানন্দা ব্যাটালিয়ন (৫৯ বিজিবি)-এর অধিনায়ক লেঃ কর্নেল মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম চৌধুরী, এসজিপি, বিএফএম, পিএসসি বলেন, “বিজিবি দেশের যুবসমাজ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে মাদকের ভয়াবহতা থেকে রক্ষা করতে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে এবং সকল প্রকার চোরাচালান রোধে বিজিবি’র এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে।”

Su Mo Tu We Th Fr Sa