
৫ বছরেই বিলীন হওয়ার পথে জনপদ, হুমকিতে কয়েক হাজার জীবন-জীবিকা
মাত্র পাঁচ বছরের ব্যবধানে প্রমত্তা বিষখালী নদীর করাল গ্রাসে বিলীন হতে চলেছে বরগুনা জেলার বামনা উপজেলার রামনা লঞ্চঘাট ও সংলগ্ন সুবিশাল বাজার। এক সময়ের ব্যস্ততম এই বাণিজ্যিক কেন্দ্রটি এখন ভাঙনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে। নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার অপেক্ষায় থাকা এই জনপদ নিয়ে স্থানীয়দের মনে বিরাজ করছে গভীর হতাশা ও আতঙ্ক। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে মানচিত্র থেকে মুছে যেতে পারে রামনা এবং এর সঙ্গে জড়িত কয়েক হাজার মানুষের জীবন-জীবিকা।
রামনা লঞ্চঘাট কেবল একটি খেয়া পারাপারের স্থান নয়, এটি ছিল পাশর্^বর্তী মঠবাড়িয়া উপজেলার একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক প্রাণকেন্দ্র। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পণ্যবাহী ট্রলার ও লঞ্চ ভিড়তো এখানে। প্রতিদিন কয়েক হাজার মানুষের পদচারণায় মুখরিত থাকতো লঞ্চঘাট ও সংলগ্ন বাজার। স্থানীয় কৃষকরা তাদের উৎপাদিত ফসল বিক্রি করতেন, জেলেরা তাজা মাছ নিয়ে আসতেন, আর ব্যবসায়ীরা চালাতেন তাদের রমরমা ব্যবসা। কিন্তু গত পাঁচ বছরে বিষখালী নদীর আগ্রাসী ভাঙন কেড়ে নিয়েছে সেই সোনালী অতীত।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ২০১৭ সাল থেকে ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করে। প্রথমে ছোট ছোট অংশে ভাঙন দেখা গেলেও গত দুই বছরে এর ভয়াবহতা বেড়েছে বহুগুণ। চোখের সামনে বিলীন হয়েছে শত শত দোকানপাট, ঘরবাড়ি, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। লঞ্চঘাটের মূল অবকাঠামোও এখন নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার দ্বারপ্রান্তে। বাজারের অধিকাংশ দোকানপাট সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছেন ব্যবসায়ীরা। যারা এখনও ভাঙন কবলিত এলাকায় রয়ে গেছেন, তাদের দিন কাটছে নির্ঘুম আতঙ্কে। কখন তাদের শেষ আশ্রয়টুকুও নদী কেড়ে নেবে।
রামনা বাজারের পুরাতন ব্যবসায়ী মো. জলিল মিয়া (৫৫) অশ্রুসিক্ত চোখে বলেন, “আমার দাদা, বাবা এই বাজারেই ব্যবসা করেছেন। আমিও ৪০ বছর ধরে এই দোকানেই বসেছি। চোখের সামনে সব শেষ হয়ে যাচ্ছে। কত মানুষ ভিটেমাটি হারিয়েছে, কত পরিবার নিঃস্ব হয়েছে। আমাদের আর যাওয়ার জায়গা নেই। সরকার যদি দ্রুত কিছু না করে, তাহলে আমরা ভেসে যাবো।”
একই কথা বলেন গৃহবধূ ফাতেমা বেগম (৪৪), যিনি সম্প্রতি তার বাড়ি হারিয়েছেন নদীভাঙনে। “আমার সব স্বপ্ন নদীতে চলে গেছে। এখন আমরা খোলা আকাশের নিচে। সন্তানদের নিয়ে কোথায় যাবো জানি না। জনপ্রতিনিধিরা শুধু আশ্বাস দেন, কিন্তু বাস্তবে কিছুই হয় না।”
শিক্ষার্থী রহিম আহমেদ (১৭) জানায়, “উত্তর রামনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভাঙনের হুমকিতে। বন্ধুদের অনেকের বাড়িঘর নদীতে চলে গেছে। আমরা আর ভালোভাবে লেখাপড়া করতে পারছি না। সব সময় একটা ভয় কাজ করে।”
নেতাদের প্রতি আকুল আবেদন: “জনপদ বাঁচান, জীবন বাঁচান”
রামনা এলাকার জনপ্রতিনিধি এবং বরগুনা-২ আসনের সকল রাজনৈতিক নেতাদের প্রতি আকুল আবেদন জানিয়েছেন রামনা ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকার জনগণ। তাদের দাবি, জরুরি ভিত্তিতে নদীভাঙন রোধে স্থায়ী পদক্ষেপ নেওয়া হোক। জিও ব্যাগ ফেলা বা সাময়িক কোনো সমাধান নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করে নদী শাসনের মাধ্যমে এই এলাকার মানুষকে রক্ষা করতে হবে।
স্থানীয় পরিবেশবিদদের মতে, অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলন এবং নদীর গতিপথ পরিবর্তনের ফলেই ভাঙন আরও তীব্র হয়েছে। এ বিষয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন।
রামনা লঞ্চঘাট ও বাজার শুধু একটি বাণিজ্যিক কেন্দ্র নয়, এটি হাজার হাজার মানুষের বেঁচে থাকার অবলম্বন। এই জনপদকে রক্ষা করা না গেলে এর বিরূপ প্রভাব পড়বে এলাকার অর্থনীতি ও সামাজিক জীবনে। আমরা আশা করি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করে রামনার মানুষের পাশে দাঁড়াবে এবং দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করে এই জনপদকে বিলীন হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করবে।
![]()









