মুখোশের আড়ালে
বিকেলের আলো তখন ফিকে হয়ে আসছে। উত্তর গোমদণ্ডী উচ্চবিদ্যালয়ের মাঠে কয়েকজন ছাত্র খেলা করছে। দূর থেকে বিদ্যালয়ের দোতলা ভবনের জানালা দিয়ে দেখা যাচ্ছে—সভাপতির কক্ষের পর্দা অল্প নড়ছে। কক্ষের ভেতরে বসে আছেন মোহাম্মদ আলী—যার নাম উচ্চারণ করলেই এলাকার অনেকে ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসে, আবার কেউ কেউ চুপ করে যায়। তার চোখে কালো ফ্রেমের চশমা, সামনে একটি মোটা ফাইল। ভেতরে সেই ফাইলের গভীরে রাখা আছে একটি সনদ—সাউদার্ন ইউনিভার্সিটির নামে তৈরি একটি জাল অনার্স সার্টিফিকেট। বছরের পর বছর সেটিই ছিল তার সবচেয়ে বড় অস্ত্র। এই সনদের জোরে তিনি হয়ে গেছেন বিদ্যালয়ের অ্যাডহক কমিটির সভাপতি। কথায় আছে—যে ক্ষমতার চাবি পায়, সে দরজার ভেতরের অন্ধকারও দেখে। মোহাম্মদ আলী এই চাবি পেয়েছিলেন সাংবাদিকতার নাম ভাঙিয়ে। একসময় প্রেসক্লাবের ভেতরে দাঁড়িয়ে ছবি তুলতেন, রাজনৈতিক নেতাদের পেছনে ঘুরতেন, খবর লিখতেন কারও দেওয়া কাগজ দেখে। মাদক মামলায় জেলে যাওয়া, দণ্ডপ্রাপ্ত হওয়া—এসব যেন তার জীবনের একেকটি পর্ব, যা ধীরে ধীরে চাপা পড়ে যায় পরিচিত মহলের প্রশ্রয়ে। প্রশ্রয়দাতা ছিলেন জাহিদুল করিম কচি—চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের সদস্য সচিব। কচির ছায়ায় থেকে আলী শিখে গিয়েছিলেন কিভাবে কথা বলতে হয়, কাকে তুচ্ছ দেখাতে হয়, কাকে পাশে রাখতে হয়। সিনিয়র সাংবাদিকদের চোখের দিকে তাকিয়ে রূঢ় ভাষায় কথা বলার সাহসও যেন এই ছায়ার ফসল। প্রেসক্লাবের কক্ষে বসে তিনি নিজের গোষ্ঠী তৈরি করলেন—যারা ছিল পদ-পদবি আর সুযোগের নেশায় মাতাল। বিদ্যালয় দখলের কৌশল ছিল নিখুঁত। প্রথমে স্থানীয় এক নেতার মাধ্যমে সুপারিশ করালেন, তারপর নথিতে জাল সনদ সংযুক্ত করলেন। চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তাদের কাছে সবকিছু এত স্বাভাবিকভাবে উপস্থাপন করলেন যে, সন্দেহের অবকাশই রইল না। কিন্তু সময়ের নিয়মে সত্য ধরা পড়ে।
তদন্ত কমিটি এলো। তারা বিশ্ববিদ্যালয়ে চিঠি দিল, উত্তর এলো—সাউদার্ন ইউনিভার্সিটির রেকর্ডে এমন কোনো সনদ নেই, এমনকি এমন কোনো রোল নম্বরও নেই।
অভিযানের দিনটি ছিল রোদেলা সকাল। বোর্ডের কর্মকর্তা যখন অপসারণের চিঠি হাতে তুলে দিলেন, আলীর ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল—যেন বলছে, “এই খেলা শেষ নয়।” বাইরে ছাত্ররা কৌতূহলী চোখে তাকিয়ে আছে, কিছু অভিভাবক ফিসফিস করছে—“এ তো সাংবাদিক মানুষ! এরকম করবে?”
কিন্তু আসল কাহিনী তখনো শেষ হয়নি। পদ হারালেও প্রভাব হারাল না আলী। প্রেসক্লাবের ভেতরে তার পদক্ষেপ আগের মতোই দৃঢ়, রিপোর্টার্স ফোরামের বৈঠকে তার কণ্ঠস্বর এখনো উচ্চ। সাংবাদিকতার নামের আড়ালে যে মাফিয়া চক্র গড়ে ওঠে, আলী ছিল তার জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। গোমদণ্ডীর বাতাসে আজকাল সন্দেহের গন্ধ ভাসে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পবিত্রতা কলুষিত হলে যে ক্ষত তৈরি হয়, তা শুধু দেয়ালে নয়, প্রজন্মের মনে গেঁথে থাকে। আলীর মতো মানুষরা সেই ক্ষতকে গভীর করে, আর ক্ষমতার খেলোয়াড়রা তাদের রক্ষা করে। এই কাহিনী বোয়ালখালীর সীমানা পেরিয়ে অনেক দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে যায়—শহরের প্রেসক্লাবের দালানে, রাজনীতির গোপন কক্ষে, এমনকি ক্যামেরার ফ্ল্যাশের ঝলকে। আর এই গল্পে যারা কলম হাতে সত্য লেখার কথা ছিল, তারা কখনও কখনও সেই কলম বিক্রি করে দেয় সামান্য প্রভাব ও সুযোগের বিনিময়ে। মোহাম্মদ আলীর মুখোশ একদিন খুলে গেছে, কিন্তু এখনো অনেক মুখোশ বাকি আছে। প্রশ্ন একটাই—মুখোশ খুলবে কে? নাকি সবাই চুপ করে থেকে আগামী দিনের আরেক আলীর জন্ম দেখতে থাকবে?