মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম বীর সেনানায়ক, ১০ম বেঙ্গল রেজিমেন্টের প্রতিষ্ঠাতা এবং বীর উত্তম খেতাবপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফকে স্মরণ
বাংলাদেশের ইতিহাসে ৭ নভেম্বর এক বেদনাবিধুর ও তাৎপর্যপূর্ণ দিন। ১৯৭৫ সালের এই দিনে সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ সংঘাত ও রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে প্রাণ হারান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম বীর সেনানায়ক মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফ (বীর উত্তম)। তাঁর সঙ্গে নিহত হন কর্নেল খন্দকার নাজমুল হুদা ও লেফটেন্যান্ট কর্নেল এ টি এম হায়দার। স্বাধীনতার মাত্র চার বছর পর দেশের মাটিতেই এমন একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশের ইতিহাসে গভীর ক্ষত হয়ে রয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধের সময় খালেদ মোশাররফ ছিলেন অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সংগঠক ও রণকৌশলী। তাঁর নেতৃত্বে গড়ে ওঠে ১০ম বেঙ্গল রেজিমেন্ট। মুক্তিযুদ্ধে তাঁর সাহসী নেতৃত্ব, সাংগঠনিক দক্ষতা ও সামরিক পরিকল্পনা পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। যুদ্ধক্ষেত্রে গুরুতর আহত হয়েও তিনি আবার দায়িত্বে ফিরে এসেছিলেন।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর দেশের রাজনৈতিক ও সামরিক পরিস্থিতি ক্রমেই অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে। একই বছরের ৩ নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে জাতীয় চার নেতাকে হত্যার ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তোলে।
এরপর ৩ নভেম্বর খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে সেনাবাহিনীতে একটি অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়। তিনি সেনাবাহিনীতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ভারসাম্য পুনঃপ্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। তবে ৭ নভেম্বর পাল্টা অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে বদলে যায়।
সেদিন সেনানিবাসে সৈনিকদের মধ্যে বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে। বিদেশী ও দেশবিরোধীদের গভীর ষড়যন্ত্রের শিকার হন দেশের এই বীর মুক্তিযোদ্ধা। রাজনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনার মধ্যে খালেদ মোশাররফ ও তাঁর কয়েকজন সহকর্মী সেনানিবাসে অবস্থান করছিলেন। একপর্যায়ে সৈন্যদের একটি দল তাঁদের অবস্থানস্থলে পৌঁছে যায়। পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
৭ নভেম্বর সকালে ঢাকা সেনানিবাসে খালেদ মোশাররফ, কর্নেল খন্দকার নাজমুল হুদা ও লেফটেন্যান্ট কর্নেল এ টি এম হায়দারকে হত্যা করা হয়। তাঁদের মৃত্যু বাংলাদেশের সামরিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ ও বিতর্কিত অধ্যায়ের সূচনা করে।
খালেদ মোশাররফ শুধু একজন সেনা কর্মকর্তা ছিলেন না; তিনি ছিলেন মহান মুক্তিযুদ্ধের সম্মুখসারির একজন সংগঠক ও সাহসী যোদ্ধা। ১৯৭১ সালে তাঁর নেতৃত্বে পরিচালিত সামরিক অভিযানগুলো পাকিস্তানি বাহিনীর যোগাযোগব্যবস্থা ও সামরিক সক্ষমতার ওপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলেছিল। মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে ‘বীর উত্তম’ খেতাবে ভূষিত করা হয়।
জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও সেনাবাহিনীর শৃঙ্খলার প্রশ্নে তাঁর ভূমিকা ইতিহাসের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকবে।
১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের হত্যাকাণ্ড আজও নানা প্রশ্ন ও ঐতিহাসিক বিতর্কের জন্ম দেয়। সময়ের পরিক্রমায় রাজনৈতিক ব্যাখ্যা ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু মুক্তিযুদ্ধে খালেদ মোশাররফের অবদান বাংলাদেশের ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
৭ নভেম্বর বিনম্র শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম বীর সেনানায়ক, মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফ (বীর উত্তম) এবং তাঁর সঙ্গে নিহত দুই বীর সেনা কর্মকর্তাকে।
তাঁদের আত্মত্যাগ ও মুক্তিযুদ্ধের অবদান ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।