বৈশাখের ভিড়ে একান্ত ভালোবাসার দীর্ঘ প্রতীক্ষা
-মো.কামাল উদ্দিন
অনেকগুলো বৈশাখ আসে—আবার হারিয়েও যায়। প্রতিটি বৈশাখ যেন নতুন করে জীবনের দুয়ারে কড়া নাড়ে, নতুন সূর্যের আলোয় মানুষকে ডাকে নতুন করে বাঁচতে, নতুন করে ভালোবাসতে। চারদিকে লাল-সাদার ঢেউ, পান্তা-ইলিশের ঘ্রাণ, ঢাকের তালে তাল মিলিয়ে মানুষের হাসিমুখ—সব মিলিয়ে এক উচ্ছ্বাসময় আয়োজন। অথচ এই উচ্ছ্বাসের মাঝেও কিছু হৃদয় নিঃশব্দ থাকে, কিছু অপেক্ষা অপূর্ণ থেকে যায়, কিছু স্বপ্ন কেবল কল্পনার মধ্যেই রঙ খুঁজে বেড়ায়।
সে এমনই এক মানুষ—যার কাছে বৈশাখ মানে শুধু ঋতুর পালাবদল নয়, বরং এক অদেখা, অপ্রাপ্ত ভালোবাসার জন্য দীর্ঘ প্রতীক্ষা। তার চারপাশে যত আনন্দই থাকুক, অন্তরের ভেতরটা যেন এক অনুচ্চারিত শূন্যতায় মোড়া। সে কখনো খুব বেশি কিছু চায়নি—চেয়েছিল একটু আপন করে ডাকা, একটু কাছে টেনে নেওয়া, একটু নির্ভেজাল ভালোবাসার ছোঁয়া।
সে কল্পনা করেছে—কেউ তাকে হঠাৎ করেই আহ্লাদে জড়িয়ে বলছে, “আজ তোমাকে নিজের মতো করে সাজাতে চাই।” তার খোঁপায় যত্ন করে গুঁজে দিচ্ছে বেলীফুলের মালা, যার সুগন্ধে মিশে থাকবে একান্ত ভালোবাসার নীরব ভাষা। তার হাতে পরিয়ে দিচ্ছে লাল রেশমি চুড়ি—যার প্রতিটি ঝংকার যেন একেকটি আবেগময় প্রতিশ্রুতি। আলতায় রাঙানো পায়ের নুপুরে যে সুর বাজবে, তা হবে শুধুই দু’জনের গোপন উৎসবের সংগীত।
একটি আটপৌরে জামদানী শাড়ি—সাধারণ অথচ গভীর ঐতিহ্যে ভরা—তার শরীরে জড়িয়ে যাবে অনাবিল সৌন্দর্যে। কপালে একটি লাল টিপ, চোখে হালকা কাজলের টান—এই সামান্য সাজেই সে হয়ে উঠতে চেয়েছিল কারো জীবনের সবচেয়ে প্রিয় দৃশ্য। হরিণির মতো সেই চাহনিতে কেউ যদি একবার হারিয়ে যেত, তাহলেই তার সমস্ত অপেক্ষা সার্থক হতো।
সে আরও কল্পনা করে—মেঘনার মোহনায় দু’জনে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে। দূরে নদীর ঢেউ, আকাশে হালকা মেঘ, আর পায়ের কাছে ছলছল করা পানি। হাতের মুঠোয় হাত রেখে, কোনো কথা না বলেও হাজারো কথা বলে ফেলা যায়—এই অনুভূতির স্বাদ সে পেতে চেয়েছে। জোয়ারের জলে পা ভিজিয়ে, বাতাসে চুল উড়িয়ে, একসাথে হারিয়ে যাওয়ার সেই মুহূর্ত—তার কাছে সেটাই ছিল জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
প্রচণ্ড গরমের দিনে, যখন কপাল বেয়ে ঘাম গড়িয়ে পড়ে, তখন কেউ যদি মমতায় তা মুছে দেয়—এই ছোট্ট স্পর্শটাই তার কাছে ছিল ভালোবাসার সবচেয়ে গভীর প্রকাশ। কোনো এক গাছের ছায়ায় বসে, দু’জনে কিছু না বলেও শুধু একে অপরের উপস্থিতি অনুভব করা—এই নীরবতাই তার কাছে ছিল সবচেয়ে বড় কথা।
কিন্তু বাস্তবতা বড় নির্দয়। কেউ তার দরজায় এসে দাঁড়ায়নি, কেউ তার ব্যস্ততার ভিড়ে একটু সময় চেয়ে নেয়নি। কেউ বলেনি—“তোমার হাজারো কাজের মাঝেও আজকের দিনটা শুধু তোমার জন্য রেখে দাও, আমি তোমার সাথে হারাতে চাই।” তার জীবনের প্রতিটি দিন কেটে গেছে দায়িত্বের ভারে, সময়ের চাপে, আর না-পাওয়া ভালোবাসার নিঃশব্দ হাহাকারে।
সে কখনো শুনতে পায়নি সেই সাহসী স্বীকারোক্তি—“আমি তোমার দুয়ারে দাঁড়িয়ে আছি, লাভ-ক্ষতির হিসেব পরে হবে, আজ শুধু তোমার সাথে একটুখানি সময় কাটাতে চাই।” এই একটি বাক্যই হয়তো তার জীবনের সমস্ত ক্লান্তি মুছে দিতে পারত, সমস্ত অভিমান গলিয়ে দিতে পারত।
তবুও সে আশা হারায় না। কারণ তার বিশ্বাস—ভালোবাসা কখনো হারিয়ে যায় না, শুধু সময়ের অপেক্ষায় থাকে। হয়তো কোনো এক বৈশাখে, যখন চারপাশ আবার রঙে রঙিন হবে, তখন হঠাৎ করেই কেউ এসে দাঁড়াবে তার সামনে। কোনো আড়ম্বর থাকবে না, থাকবে না বড় কোনো আয়োজন—শুধু থাকবে সত্যিকারের অনুভূতির নিঃশব্দ দীপ্তি।
সেই মানুষটি হয়তো বলবে—“এবারের বৈশাখটা শুধু তোমার নয়, আমাদের হোক।” আর তখনই তার সমস্ত অপেক্ষা, সমস্ত না-পাওয়া, সমস্ত অভিমান এক নিমিষে মিলিয়ে যাবে। বৈশাখ তখন আর কেবল ক্যালেন্ডারের একটি দিন থাকবে না—সেটি হয়ে উঠবে জীবনের এক অনন্য অধ্যায়, যেখানে ভালোবাসা থাকবে নিঃশর্ত, আর দুটি হৃদয় খুঁজে পাবে তাদের নিজস্ব রাজ্য।
এই দীর্ঘ প্রতীক্ষার ভেতরেই সে বেঁচে থাকে, স্বপ্ন দেখে, আর প্রতিটি বৈশাখে নতুন করে বিশ্বাস করে—একদিন না একদিন, তার সেই কাঙ্ক্ষিত আহ্বান ঠিকই এসে পৌঁছাবে তার।