
“বুদ্ধ-কীর্তন: ঐতিহ্য, শিক্ষা ও নতুন ভাবনা”
সমীর কান্তি বড়ুয়া
বাংলাদেশের বৌদ্ধ সমাজে কীর্তনের একটি দীর্ঘ এবং সমৃদ্ধ ঐতিহ্য রয়েছে। ধর্মীয় অনুষ্ঠান, বুদ্ধ পূর্ণিমা, প্রবারণা, সংঘদান, কঠিন চীবর দান কিংবা অন্যান্য পুণ্যানুষ্ঠান—প্রায় সর্বত্রই কীর্তন মানুষের হৃদয়ে ভক্তি, আবেগ ও আনন্দের সঞ্চার করে। এ ঐতিহ্য আমাদের সাংস্কৃতিক পরিচয়েরও একটি অংশ হয়ে গেছে।
“বিণয়ের সাথে বলি — আমার এই লেখার উদ্দেশ্য প্রচলিত বুদ্ধ কীর্তনের সমালোচনা নয়; বরং বুদ্ধের মূল শিক্ষার সঙ্গে তার সামঞ্জস্য নিয়ে একটি গঠনমূলক আলোচনা শুরু করা।”
বর্তমানে প্রচলিত বুদ্ধ-কীর্তনের ভাব এবং ভাষা সর্বাংশে বুদ্ধের শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না—এই প্রশ্নটি অনেকের মনেই কখনো কখনো জাগে। তবে অধিকাংশ মানুষ স্বাভাবিকভাবেই কীর্তনের ভক্তিময় পরিবেশ উপভোগ করতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।
কয়েকবছর আগে ফেইসবুকে সরাসরি সম্প্রচারিত একটি আলোচনা অনুষ্ঠানে বিদগ্ধ গবেষক লেখক অধ্যক্ষ শিমুল বড়ুয়া এবং একসময়য়ের কীর্তিমান ফুটবলার এবং বর্তমান সময়ে বুদ্ধ কীর্তনের ধারাকে সর্বস্তরের মানুষের কাছে অধিকতর জনপ্রিয় করে তোলার ক্ষেত্রে নিষ্ঠাবান কীর্তনীয়া শাক্যপদ বড়ুয়ার সাথে বুদ্ধ-কীর্তন এর পরিমার্জন নিয়ে স্বল্প সময়ের মত-বিনিময় করার সুযোগ ঘটেছিল।
বাংলার সামগ্রিক সংস্কৃতির প্রভাব বলয়ে অবস্থানের কারণে — বুদ্ধ-কীর্তন অন্যান্য কীর্তন ধারা দ্বারা নানাভাবে প্রভাবিত হয়ে একটি মিশ্র ধারায় গড়ে উঠেছে। পাশাপাশি অবস্থানের কারণে কোন এক সমাজের সাংস্কৃতিক প্রভাব এবং প্রকাশভঙ্গি অন্য সমাজকে প্রভাবিত করাটা স্বাভাবিক।
বুদ্ধ কীর্তনের ক্ষেত্রেও এমনটা ঘটেছে।
বৌদ্ধ সমাজের প্রয়াত ও জীবিত অনেক প্রাজ্ঞ সুধীজন, সঙ্গীতজ্ঞ এবং অভিজ্ঞ কীর্তনীয়াগন বিভিন্ন সময়ে কীর্তনের ভাষা পরিবর্তন ও পরিবেশনের ক্ষেত্রে, বুদ্ধের শিক্ষা তথা বৌদ্ধ ধর্মীয় ভাষাকে অধিকতর স্পষ্ট ও স্বাতন্ত্র্যময় করে তোলার চেষ্টা করেছেন। নানাবিধ সীমাবদ্ধতা এবং প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে না পারলেও অনেকের মধ্যে সেই প্রয়াস এখনো চলমান।
বুদ্ধের শিক্ষা– দুঃখকে বুঝা, কারণকে জানা, চিত্তকে রূপান্তর করা এবং অনুশীলনের মাধ্যমে মুক্তির পথে এগিয়ে যাবার শিক্ষা। সেই নিরিখে বুদ্ধ-কীর্তনের ভাষাতেও মৈত্রী-করুণা-মুদিতা, শীল-সমাধি-প্রজ্ঞা, অনিত্য- দু:খ-অনত্তা, প্রতীত্যসমুৎপাদ এবং অনুশীলনের চেতনা অধিকতর সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হলে তা শ্রোতাদের বুদ্ধবাণীর আরও কাছাকাছি নিয়ে যাবে — এমন বোধ অনেকের মধ্যে কাজ করে।
সেকারণে বুদ্ধ-কীর্তনের ভাষা ও উপস্থাপনার ক্ষেত্রে কিছু বিষয় নিয়ে পুনর্বিবেচনার সুযোগ রয়েছে—এমন অনুভূতি অনেকের মধ্যেই কাজ করে। বুদ্ধের শিক্ষার সঙ্গে পূর্ণ সামঞ্জস্য রেখে নতুন করে বুদ্ধ-কীর্তনের ভাষা ও কাঠামো নির্মাণ সহজ কাজ নয়। যে কারণে এই ক্ষেত্রটি এখনো গভীর গবেষণা, সৃজনশীলতা ও সম্মিলিত প্রচেষ্টার অপেক্ষায় রয়েছে।
কথাগুলো বলার অর্থ এই নয় যে, এতদিন যা গাওয়া হয়েছে বা এখনো যা গাওয়া হচ্ছে — তার সবকিছুই অগ্রহণযোগ্য। বরং যাঁরা বছরের পর বছর কীর্তন পরিবেশনের মাধ্যমে বিভিন্ন পারিবারিক সামাজিক অনুষ্ঠানে ধর্মীয় আবহ সৃষ্টি করে চলেছেন, তাঁদের অবদান অবশ্যই শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণীয়।
অসংখ্য গুনী কীর্তন শিল্পীর মেধা, ত্যাগ এবং অগনিত বিনীদ্র রাত কাটানো শ্রমের ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েই — পরবর্তী প্রজন্মের জন্য অধিকতর সুসংহত এবং সুবিন্যস্ত বুদ্ধবাণীসম্মত, মৌলিক বুদ্ধ কীর্তনের একটি ধারা গড়ে তোলা সম্ভব কিনা — সেটা নিয়ে ভাবনার উদ্রেক সৃষ্টির লক্ষ্যেই বিষয়টির অবতারণা।
কীর্তনের পরিচিত সুরের আবহ বজায় রেখেও ইতিমধ্যে অনেক স্বনামধন্য কীর্তনীয়া নতুন কথা রচনা করেছেন — যা এখনো চলমান। ভক্তির আবেগ অটুট রেখে বুদ্ধের মূল শিক্ষার সঙ্গে মোটামুটি সামঞ্জস্যপূর্ণ নতুন বানী সংযোজন করার দৃষ্টান্ত কম নয়।
তারপরও অলৌকিকতার পরিবর্তে কার্যকারণ, অন্ধ নির্ভরতার পরিবর্তে আত্মজাগরণ এবং আবেগের পাশাপাশি প্রজ্ঞার আহ্বান—এসব বিষয়কে উপজীব্য করে আগামী দিনের বুদ্ধ কীর্তনের নতুন কাঠামো দাঁড় করানো যায় কিনা সেই লক্ষ্যেই আজকের বিনীত প্রস্তাবনা।
একটি আলোচনা একটি সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচনের প্রয়াস। যদি বৌদ্ধ সমাজের সম্মানিত সকল কীর্তনশিল্পী, গীতিকার, সুরকার, ভিক্ষুসংঘ এবং কীর্তনানুরাগী নারী-পুরুষ এবিষয়ে আন্তরিকভাবে সচেতন হন, তবে সবাই মিলে একটি পরিশোধিত ও পরিমার্জিত বুদ্ধ-কীর্তনের ধারা গড়ে তোলা সম্ভব।
এমন একটি কাজের বাস্তব রূপায়ণ, একদিকে যেমন আমাদের সংস্কৃতির ধারাবাহিকতাকে যথার্থভাবে ধারণ করবে, অন্যদিকে বুদ্ধের বিশুদ্ধ শিক্ষাকেও যথার্থভাবে মানুষের হৃদয়ে পৌঁছে দিতে সক্ষম হবে।
এখনো আমাদের কোন কোন কীর্তন আসরে এমন কিছু কীর্তন পরিবেশিত হয় — যেগুলো বুদ্ধের শিক্ষার সাথে যায় না। কোনো নির্দিষ্ট কীর্তনের নাম উল্লেখ করা না হলেও বিষয়টি সহজে অনুধাবন করা যায়।
মূল লক্ষ্য কীর্তনের আমূল পরিবর্তন নয়, বরং সুর এবং ভাব অপরিবর্তিত রেখে, বুদ্ধের শিক্ষার সাথে অসংগতিপূর্ণ অংশগুলোর সংস্কার করা।
কীর্তনের সাথে নিবিড়ভাবে সংশ্লিষ্ট সবার কাছে এই লেখাটি পৌঁছাবেনা — তা নিশ্চিত। যাঁদের নজরে আসবে — অনুগ্রহ করে বিষয়টি যতটা সম্ভব সবার সাথে শেয়ার করলে লেখার উদ্দেশ্য সফল হবার সুযোগ তৈরি হবে। কারণ এটি শুধুমাত্র কোন বিশেষ মহলের চিন্তার বিষয় নয়। তাই পরিবর্তনের বার্তা সর্বস্তরের মানুষের কাছে পৌঁছানো প্রয়োজন।
বৌদ্ধ সমাজের লেখক, গবেষক, শিক্ষক, ভিক্ষুসংঘ, কীর্তনশিল্পী, সুরকার, গীতিকার, বিভিন্ন পেশার নাগরিক এবং সকল বৌদ্ধ সংগঠনের নেতৃবৃন্দ—সবার সম্মিলিত অংশগ্রহণ ও পৃষ্ঠপোষকতা থাকলে এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন অনেক সহজ হবে।
ঐতিহ্যকে অস্বীকার নয়, বরং বুদ্ধের বিশুদ্ধ শিক্ষার আলোকে বুদ্ধ-কীর্তনকে আরও পরিশীলিত ও সমৃদ্ধ করাই এই ভাবনার মূল উদ্দেশ্য। মতভেদ থাকলেও আন্তরিক আলোচনা থেকে উত্তম পথের সন্ধান মিলতে পারে এই প্রত্যাশায় —-
সবার মঙ্গল কামনা করছি।
![]()









