নওগাঁর মান্দায় আদালতের নির্দেশে বিরোধপূর্ণ জমি সরেজমিন তদন্ত করলেন এসিল্যান্ড
নওগাঁর মান্দায় আদালতে মামলা চলমান থাকা একটি বিরোধপূর্ণ জমি সরেজমিন তদন্ত করেছেন সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট নাবিল নওরোজ বৈশাখ। আদালতের নির্দেশে বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) বেলা ১১টার দিকে মান্দা সদর ইউনিয়নের কামারকুড়ি মৌজায় গিয়ে তিনি এ তদন্ত করেন।
এ সময় এসিল্যান্ড কার্যালয়ের সার্ভেয়ার এমদাদুল হক, মামলার বিবাদী ও ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা (টিডিয়ার) দুলাল হোসেন, তার স্ত্রী সানজিদা খানম, মামলার বাদী আল মামুন, সাংবাদিক ও সার্ভেয়ার মাহবুবুজ্জামান সেতু, আমিন কাজী কামরুজ্জামান ও হোসেন আলী, মান্দা সদর ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক রোকনুজ্জামান গামা, সাবেক ইউপি সদস্য খাইরুল ইসলাম,সাবেক আর্মি আব্দুল কাদের, স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা শামীম হোসাইন, ছাত্রদল নেতা রাজু এবং গামছা জলিলসহ স্থানীয়রা উপস্থিত ছিলেন।
স্থানীয় ও মামলার নথি সূত্রে জানা যায়, কামারকুড়ি মৌজার হাল খতিয়ান নম্বর ১৬৫, ১৬৬, ১৬৭, ১৬৮, ১৬৯ ও ২১২-এর মূল মালিক ছিলেন কামারকুড়ি গ্রামের মৃত সমতুল্য মন্ডলের তিন ছেলে ময়েন মন্ডল, মহির মন্ডল ও নূর উদ্দিন মন্ডল এবং দুই স্ত্রী সঞ্জা বেওয়া ও হাজেরা বিবি। পরবর্তীতে সম্পত্তির মালিকানা নিয়ে বিরোধের সূত্রপাত হয়।
মামলার বাদী আল মামুনের দাবি, তার বাবা মহির মন্ডলের নিজ অংশ এবং ১৯৭৩ সালে তার বাবার বোন দিনজান ও হাজেরা খাতুনের কাছ থেকে কবলামূলে পাওয়া সম্পত্তি দীর্ঘদিন ভোগদখলে রাখেন। পরে ২০০৮ সালে তিনি ওই সম্পত্তি তার দুই ছেলে হাবিবুর রহমান ও আল মামুনের কাছে হস্তান্তর করেন। এর মধ্যে ১৬৯ নম্বর খতিয়ানের ১৯১, ১৯৯ ও ২০০ নম্বর দাগে থাকা বিরোধপূর্ণ জমিও রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
অন্যদিকে হাজেরা বিবির মৃত্যুর পর তার ছেলে-মেয়েদের উত্তরাধিকারীরা ২০১৫-১৭ সালের ২৮৭৭/ওঢ নম্বর খারিজ কেস মূলে একটি প্রস্তাবিত খতিয়ান প্রস্তুত করেন। খতিয়ানটির নম্বর ৭৩৯ এবং জমির পরিমাণ ৪২৬০ সহস্রাংশ বলে জানা গেছে। পরবর্তীতে ২০১৯ সালে ওই সম্পত্তি কামারকুড়ি গ্রামের আহাদের ছেলে শফিকুল ইসলাম ও সাইদুলের স্ত্রী রেহেনার কাছে হস্তান্তর করা হয়।
পরে শফিকুল ইসলাম ও রেহেনা বিষ্ণপুর ইউনিয়নের কয়লাবাড়ি গ্রামের দুলাল হোসেন ও তার স্ত্রী সানজিদা খানমের কাছে সাড়ে ৮ শতাংশ জমি হস্তান্তর করেন। এরপর ২০২৩ সালে দুলাল হোসেন বিরোধপূর্ণ জমিতে মাটি ভরাট করে ১৯১, ১৯৯ ও ২০০ নম্বর দাগে ইটের দেয়াল দিয়ে ঘেরাও করে দখলে নেন বলে অভিযোগ করেন আল মামুন।
এ ঘটনায় একাধিক মামলা চলমান রয়েছে। এর মধ্যে নওগাঁর অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৪৪/১৪৫ ধারায় মামলা করেন আল মামুন। মামলাটির নম্বর ১৪৭৪ মিস/২০২৩ (মান্দা)। মামলায় ঘাটকৈর গ্রামের মৃত সৈয়দ আলীর ছেলে শহিদুল ইসলাম, তার ছেলে শহিদুল ইসলামের স্ত্রী ডলি এবং কয়লাবাড়ি গ্রামের দুলালের স্ত্রী সানজিদা খানমকে আসামি করা হয়।
পরবর্তীতে আদালত মামলাটি নামঞ্জুর করলে এর বিরুদ্ধে দায়রা জজ আদালতে ১৬৪/২৫ নম্বর ফৌজদারি রিভিশন মামলা করেন আল মামুন। মামলাটি বর্তমানে চলমান রয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে দুলাল হোসেন বলেন, আল মামুন তার বাবা মহির মন্ডল ১৯৭৩ সালে আপন বোন দিনজান ও হাজেরা খাতুনের কাছ থেকে জমি কিনেছেন দাবি করে একটি দলিল দেখিয়ে তার কবলাকৃত জমি দখলে নিতে বাধা দিচ্ছেন। এছাড়াও তার কবলাকৃত জমিতে রোপিত কলাগাছ কর্তন এবং নির্মিত ইটের ঘর ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। এসব বিষয় নিয়ে একের পর এক মামলা দিয়ে তাকে হয়রানি করা হচ্ছে।
দুলাল হোসেন আরও বলেন, ‘আমি কাগজে-কলমে জমি না পেলে দখল ছেড়ে দেব।’
তিনি আরও দাবি করেন, ১৯৭৩ সালের যে দলিল দেখানো হচ্ছে, তার কোনো ভলিউম নেই। রেকর্ড রুম থেকে দলিল যাচাই করে প্রতিবেদন নেওয়া হয়েছে। সেখানেও ওই দলিলের কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে আল মামুনের দাবি, বিরোধপূর্ণ জমিটি তাদের পৈত্রিক ও কবলামূলে পাওয়া। প্রায় ৫০-৬০ বছর ধরে তারা ওই জমি ভোগদখল করে আসছেন। জমিতে তিন শতাধিক বাঁশঝাড়, একটি বড় তালগাছ এবং আমসহ বিভিন্ন প্রজাতির ফলজ ও বনজ গাছ ছিল।
তার অভিযোগ, বিগত আওয়ামীলীগ সরকারের সময়ে দলীয় প্রভাব খাটিয়ে এসব গাছ কেটে জমিতে মাটি ভরাট করে ইট দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে। পরে ভরাট করা জমিতে ছোট একটি ঘর নির্মাণ ও কলাগাছ লাগিয়ে জবরদখলের চেষ্টা করা হয়। এতে বাধা দিতে গেলে তারা বিভিন্ন ধরনের হুমকির মুখে পড়ছেন।
আল মামুন বলেন,‘আমাদের পৈত্রিক ও কবলামূলে পাওয়া জমি দীর্ঘদিন ধরে আমরা ভোগদখল করে আসছি। কিন্তু প্রশাসনিকভাবে প্রভাব খাটিয়ে জমিটি দখলের চেষ্টা করা হচ্ছে। আমরা আদালতের ওপর আস্থাশীল। আদালতের নির্দেশে সরেজমিন তদন্ত হওয়ায় প্রকৃত বিষয়টি বেরিয়ে আসবে।’
আদালতের নির্দেশে সহকারী কমিশনার (ভূমি) নাবিল নওরোজ বৈশাখের সরেজমিন তদন্তের মধ্য দিয়ে বিরোধপূর্ণ জমির প্রকৃত অবস্থা ও দখল পরিস্থিতি যাচাইয়ের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তদন্তে পাওয়া তথ্য ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্রের ভিত্তিতে পরবর্তী আইনগত কার্যক্রম নির্ধারিত হবে।