নওগাঁয় অপহরণ মামলার তদন্তে পিবিআই
নওগাঁয় দিনদুপুরে নিজ বাড়ি থেকে অস্ত্রের মুখে অচেতন করে মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগের ২৬ দিন পেরিয়ে গেলেও সন্ধান মেলেনি হাবিবা ইয়াসমিন চমকের (৩০)। মেয়েকে ফিরে পেতে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন অসহায় বাবা দুলাল হোসেন। দীর্ঘদিনেও মেয়ের কোনো সন্ধান না পাওয়ায় চরম উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটছে পরিবারের সদস্যদের।
এদিকে চমকের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরে এসেছে। আদালতের নির্দেশে মামলাটি তদন্ত করছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই), নওগাঁ। পাশাপাশি বিষয়টি এসআরবি-৫,সিপিসি-৩,জয়পুরহাট ইউনিটের নজরেও এসেছে বলে জানা গেছে। তবে চমকের অবস্থান শনাক্ত কিংবা তাঁকে উদ্ধারের বিষয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো অগ্রগতির তথ্য পাওয়া যায়নি।
নিখোঁজ চমক নওগাঁ সদর উপজেলার কীর্ত্তিপুর ইউনিয়নের কীর্ত্তিপুর (নূরাপাড়া) গ্রামের দুলাল হোসেনের মেয়ে।
পিবিআইয়ের তদন্তকারী কর্মকর্তা ইন্সপেক্টর প্রতাপ কুমার বলেন, “মামলাটি তদন্তাধীন রয়েছে। ভিকটিমকে উদ্ধারের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।”
মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, গত ২০ সেপ্টেম্বর সকাল সাড়ে ১০টার দিকে চমকের বাবা দুলাল হোসেন ও তাঁর ভাই কাজের উদ্দেশ্যে বাড়ির বাইরে যান। ওই সময় বাড়িতে চমক ও তাঁর মা অবস্থান করছিলেন। এ সুযোগে বদলগাছী উপজেলার আধাইপুর ইউনিয়নের কার্তিকাহার (মিস্ত্রীপাড়া) গ্রামের রিয়াদ হোসেন তাঁর পরিবারের সদস্য ও সহযোগীদের নিয়ে একটি সাদা রঙের মাইক্রোবাসে করে সেখানে আসেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
এজাহারের বিবরণ অনুযায়ী, রামদা, চাকু, ছোরা ও লোহার রডসহ দেশীয় অস্ত্র নিয়ে অভিযুক্তরা জোরপূর্বক বাড়িতে প্রবেশ করেন। এরপর অস্ত্রের মুখে মা-মেয়েকে হত্যার হুমকি দিয়ে চমককে টেনেহিঁচড়ে বাড়ি থেকে বের করে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়।
মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, একপর্যায়ে রিয়াদ চেতনানাশক ওষুধ মেশানো রুমাল দিয়ে চমকের মুখ চেপে ধরেন। এতে তিনি অচেতন হয়ে পড়লে তাঁকে মাইক্রোবাসে তুলে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়।
আদালতে দাখিল করা মামলার আরজিতে অভিযোগ করা হয়েছে, রিয়াদ দীর্ঘদিন ধরে চমককে অনৈতিক প্রস্তাব দিয়ে আসছিলেন। এতে রাজি না হওয়ায় তাঁকে বিভিন্নভাবে উত্ত্যক্ত ও হয়রানি করা হতো। চমকের বিয়ের পরও এসব হয়রানি বন্ধ হয়নি বলে দাবি করেছেন মামলার বাদী। তাঁর অভিযোগ, রিয়াদের অব্যাহত হয়রানির কারণে একপর্যায়ে চমকের প্রথম সংসার ভেঙে যায়।
ঘটনার পর মেয়েকে উদ্ধারের আশায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে অভিযুক্তদের বাড়িতে যান দুলাল হোসেন। কিন্তু সেখানে মেয়ের সন্ধান না পেয়ে উল্টো মারধর, হত্যা ও মরদেহ গুম করার হুমকির মুখে পড়েন বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে।
দুলাল হোসেনের অভিযোগ, ঘটনার পরদিন ২১ সেপ্টেম্বর সকালে নওগাঁ সদর মডেল থানায় মামলা করতে গেলে পুলিশ মামলা গ্রহণ না করে আদালতে যাওয়ার পরামর্শ দেয়। পরে ২২ সেপ্টেম্বর নওগাঁর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-১-এ মামলা করেন তিনি।
মামলাটির নম্বর ১৫০/২০২৬ (নাঃ শিঃ)। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৭, ৯(১) ও ৩০ ধারায় দায়ের করা মামলায় প্রধান আসামি করা হয়েছে বদলগাছী উপজেলার আধাইপুর ইউনিয়নের কার্তিকাহার (মিস্ত্রীপাড়া) গ্রামের পিন্টু হোসেনের ছেলে রিয়াদ হোসেনকে (২৮)।
অন্য আসামিরা হলেন রিয়াদের ভাই মাহবুব হোসেন (২৪), বাবা পিন্টু হোসেন (৫৫), মা রোকেয়া বেগম এবং অজ্ঞাতপরিচয় আরও চার থেকে পাঁচজন।
মেয়ের কোনো সন্ধান না পেয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন দুলাল হোসেন ও তাঁর স্বজনেরা। দুলাল হোসেন বলেন, “আমার মেয়েকে দিনদুপুরে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গেছে। এত দিন হয়ে গেল, এখনো তার কোনো খোঁজ পাইনি। কোথায় রেখেছে, কী অবস্থায় আছে, কিছুই জানি না। আসামিরা আমার মেয়েকে আটকে রেখে নির্যাতন করছে, নাকি মেরে লাশ গুম করেছে, সেই আতঙ্কে দিন কাটছে আমাদের।”
তিনি আরও বলেন, “আমি আমার মেয়েকে জীবিত ফিরে পেতে চাই। প্রশাসনের কাছে একটাই দাবি, দ্রুত আমার মেয়েকে উদ্ধার করে জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হোক।”
এর আগে নওগাঁ সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আসাদুজ্জামান জানিয়েছিলেন, ভুক্তভোগীর পরিবারকে আইনগত পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। চমককে উদ্ধার এবং ঘটনায় জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে পুলিশ তৎপর রয়েছে।
আদালতের নির্দেশে পিবিআইয়ের তদন্ত এবং সংবাদ প্রকাশের পর বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অন্য ইউনিটের নজরে আসায় নতুন করে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে পরিবারের মধ্যে। তবে ২৬ দিনেও চমকের সন্ধান না মেলায় উদ্বেগ কাটছে না স্বজনদের।
তাঁদের দাবি, ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠা ব্যক্তিদের অবস্থান শনাক্ত, ঘটনার দিন ব্যবহৃত মাইক্রোবাসের তথ্য সংগ্রহ এবং সম্ভাব্য সব সূত্র যাচাই করে চমককে উদ্ধারে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হোক।
নিখোঁজের প্রতিটি দিন চমকের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে পরিবারের। তাই তদন্তের পাশাপাশি তাঁকে জীবিত উদ্ধারের বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্বজন ও স্থানীয় বাসিন্দারা। অভিযোগের সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।