- - -

এস এম আবুল কালাম : ’৭৫-পরবর্তী দুঃসময়ের আওয়ামী লীগ নেতা

fb img 1792502472502
Print News

এস এম আবুল কালাম : ’৭৫-পরবর্তী
দুঃসময়ের আওয়ামী লীগ নেতা

নাসিরুদ্দিন চৌধুরী

 

’৭৫-এর ১৫ আগস্ট আওয়ামী লীগের ওপর নরক ভেঙে পড়েছিল। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যা করার পর সারা দেশ শোকে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। সে সময় বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা বিদেশে থাকায় প্রাণে বেঁচে গিয়েছিলেন। ঘাতকরা শুধু বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেনি, তারা গণতন্ত্রকেও হত্যা করেছিল। সামরিক শাসন জারি করে আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, শ্রমিক লীগ ও কৃষক লীগ সহ আওয়ামী লীগের সমস্ত অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর রাজনীতি ও সাংগঠনিক তৎপরতা নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। ৫/৬ বছর সামরিক শাসনের যাঁতাকলে নিষ্পেষিত যখন হাঁসফাঁস করছিল, ঠিক তেমনি এক শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতিতে বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনা গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারসহ জাতিকে স্বৈরাচারের কবল থেকে মুক্তি করার জন্য ১৯৮১ খ্রিস্টাব্দে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দেশে ফিরে আসেন। তার আগে সেনা শাসক জিয়াউর রহমান রাজনীতিবিদ হওয়ার জন্য সামরিক শাসন প্রত্যাহার করে রাজনৈতিক তৎপরতার ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেন এবং ১৯৭৯ খ্রিস্টাব্দে দেশে নির্বাচন দেন। শেখ হাসিনার আগমনে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা আবার সংগঠিত হয়ে মাঠে উত্তাপ সঞ্চার করেন।
১৫ আগস্টের পর আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতারা হয় জেলে না হয় আত্মগোপন করে প্রাণ রক্ষা করেন। এই সময় আওয়ামী লীগে নেতৃত্ব শূন্যতা বিরাজ করছিল এবং দলের নেতাকর্মীদের মনে সাহস সঞ্চার করে দল পুনর্গঠন করতে দলের হাল ধরার জন্য উপযুক্ত নেতৃত্বের অভাব ছিল। চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলায় আওয়ামী লীগের হাল ধরার জন্য সিনিয়র নেতা অধ্যাপক নুরুল ইসলাম চৌধুরী, জাকেরুল হক চৌধুরী, এ কে এম আবদুল মন্নান, ইদ্রিস বি.কম, আতাউর রহমান কায়সার, আখতারুজ্জামান বাবুর মতো নেতারা অধিকাংশ জেলে অবস্থান করছিলেন এবং যারা বাইরে ছিলেন তাদের পক্ষেও রাজনৈতিক তৎপরতা চালানো দুঃসাধ্য ছিল; এই সময় বোয়ালখালী থেকে জনাব এসএম আবুল কালাম আওয়ামী লীগের কান্ডারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন। দক্ষিণ চট্টগ্রামের রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা এখনও তাঁর সেদিনের সাহসী ভূমিকা স্মরণ করে নতুন করে সংগ্রামী চেতনায় উদ্বুদ্ধ হন।
বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও সমাজসেবী জনাব এস এম আবুল কালাম ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দের ১১ জানুয়ারি চট্টগ্রামের বোয়ালখালী থানার কধুরখীল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মরহুম মোজাহের ঔষধালয়-খ্যাত আয়ুর্বেদ চিকিৎসক ও ব্যবসায়ী আলহাজ্ব এস এম মোজাহেরুল হক। মাতা আলহাজ্ব জামেনা হক।
জনাব এম এম আবুল কালাম এর সাত ভাই ও দুই বোন। ভাই-বোনদের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়। সবার বড় এস এম আবু তাহের, তারপর মরহুম অধ্যাপক আবু জাফর, আবু মহসিন (সাবেক চেয়ারম্যান, এনসিসি ব্যাংক), আবুল মনসুর, আবু তৈয়ব (সাবেক পরিচালক, চট্টগ্রাম চেম্বার অফ কমার্স) ও আবুল হাশেম। বোনেরা হচ্ছেন মরহুমা সখিনা খাতুন ও হাসিনা খাতুন।
জনাব এস এম আবুল কালাম ছোটবেলায় গ্রামে কধুরখীল স্কুলে পড়াশোনা করেন। পরে চট্টগ্রাম মিউনিসিপ্যাল স্কুল থেকে মাধ্যমিক শেষ করে চট্টগ্রাম সিটি কলেজে ভর্তি হন। ১৯৬৪ খ্রিস্টাব্দে সিটি কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাস করে চট্টগ্রাম কলেজে স্নাতক শ্রেণিতে ভর্তি হন। ১৯৬৭ খ্রিস্টাব্দে তিনি চট্টগ্রাম কলেজ থেকে গ্র্যাজুয়েশন করেন।
সিটি কলেজে অধ্যয়নকালে তিনি রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। কলেজে ছাত্রলীগের নির্বাচনী সংগঠন অভিযাত্রিকের সদস্য এবং ছাত্র সংসদের সমাজকল্যাণ সম্পাদক ছিলেন। ১৯৬৪ খ্রিস্টাব্দে শিক্ষা আন্দোলনে চট্টগ্রামের মূল নেতা ছিলেন মরহুম এম এ মান্নান। তাঁর নেতৃত্বে জনাব এস এম আবুল কালাম সেই আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। চট্টগ্রাম কলেজে আসার পর মরহুম আশরাফ খানের নেতৃত্বে ছাত্রলীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করেন। এসময় কলেজে যেসব মিটিং-মিছিল হয়েছে তিনি সেগুলিতে যোগদান করতেন।
১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে মুক্তিযুদ্ধের সময় জনাব কালাম আবুল হোসেন কমান্ডার, আহমদ হোসেন সহ অনেক মুক্তিযোদ্ধাকে বিভিন্নভাবে সাহায্য সহযোগিতা করেন। তাদের সেল্টার ছিল জনাব এস এম আবুল কালাম এর বাড়ি। এছাড়াও গ্রামের অসংখ্য লোককে তারা সাহায্য করতেন।
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে বোয়ালখালীর এমপি ডাক্তার মান্নানের সাথে তাঁর যোগাযোগ ছিল। তিনি তখন ভারতে। ৭০-এর নির্বাচনে ডাক্তার মান্নান বোয়ালখালী থেকে এম.পি. হয়েছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের শেষের দিকে জনাব আবুল কালাম শহরের বাড়িতে চলে আসেন। চট্টগ্রাম শহরে তাদের বাড়ির ঠিকানা ছিল আয়েশা খাতুন লেইন, চন্দনপুরা।
শহরের বাড়িতে থাকার সময়ই পাকিস্তানি সেনাবাহিনী হঠাৎ একদিন তাদের বাড়ি ঘেরাও করে ফেলে এবং জনাব এস এম আবুল কালামসহ তাদের সকল ভাইকে বাসা থেকে বের করে নিয়ে আসে। তাদের উদ্দেশ্যে ছিল সেনা ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া। সেদিন রাইসা বেগম নামে তাদের একজন ভাড়াটিয়া তাদেরকে রক্ষা করেছিলেন। রাইসা বেগম চন্দ্রঘোনা কর্ণফুলী পেপার মিলের কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার এর স্ত্রী ছিলেন। তাঁর স্বামী ছিলেন মরহুম কালু খান। রাইসা বেগম বাসায় মূলত একাই থাকতেন এবং তিনি খুব ভালো উর্দু জানতেন। তাই তিনি জনাব এস এম আবুল কালামসহ তার ভাইদের রক্ষা করার জন্য পাঞ্জাবিদের সাথে রীতিমতো তর্কে লিপ্ত হন এবং কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে পাঞ্জাবীদের বুঝিয়ে সেখান থেকে বিদায় করেন। উক্ত ভদ্রমহিলার দয়ায় সেদিন জনাব এস এম আবুল কালাম ও তাঁর ভাইয়েরা প্রাণে বেঁচে গিয়েছিলেন।
১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দে বঙ্গবন্ধুর শাহাদাতের পর আওয়ামী লীগের ওপর চরম নির্যাতন নেমে আসে। আওয়ামী লীগ নেতাদের ধরপাকড় শুরু হয়, গ্রেফতার এড়াতে অনেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছিলেন, দলের সেই দুঃসময়ে জনাব এস এম আবুল কালাম রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকায় তৎপর হয়ে ওঠেন । বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদে মরহুম এস এম ইউসুফ, আনোয়ারুল আজিম, গোলাম রব্বানী, আহমদ হোসেন, মান্নান (ছাত্রনেতা), শামসুজ্জামান সহ সকলের সাথে তিনিও বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদে গৃহিত আন্দোলন কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করেন এবং দলকে নানাভাবে সাহায্য সহযোগিতা করেন। ১৯৭৭ খ্রিস্টাব্দে আওয়ামী লীগের প্রথম সম্মেলনে জনাব এস এম আবুল কালাম বোয়ালখালী উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য এবং ১৯৭৯ খ্রিস্টাব্দে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৮৫ খ্রিস্টাব্দে তিনি বোয়ালখালী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৮৬ এবং ২০০১ খ্রিস্টাব্দে তিনি বোয়ালখালী থেকে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে করেছিলেন। ১৯৯৭ খ্রিস্টাব্দে তিনি চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সহ সভাপতি নির্বাচিত হন। তারও আগে ১৯৮১ খ্রিস্টাব্দে তিনি চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক বিষয়ক সম্পাদক ছিলেন।
২০১৬ খ্রিস্টাব্দে জনাব এস এম আবুল কালাম কুয়েতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
এছাড়াও ব্যবসায়ী নেতা হিসেবে তিনি চিটাগাং চিটাগাং চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি, চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ এর পরিচালক এবং অগ্রণী ব্যাংক এর পরিচালক (১৯৯৬-২০০১) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

Loading

Facebook
Twitter
LinkedIn
Su Mo Tu We Th Fr Sa