আব্দুল্লাহ আল নোমান: এক সাহসী পুরুষ, এক ইতিহাস, এক চট্টগ্রাম
--মো.কামাল উদ্দিন
যারা হৃদয়ে ইতিহাস ধারণ করেন, তারা কখনো মৃত নন। তাঁদের কর্ম, তাঁদের দর্শন, তাঁদের মানুষের প্রতি ভালোবাসা—এসবই তাঁদের অমর করে রাখে সময়ের প্রবাহে। চট্টগ্রামের ইতিহাসে যাঁর নাম শ্রদ্ধাভরে উচ্চারিত হবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে, তিনি হলেন আব্দুল্লাহ আল নোমান। একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা, প্রাজ্ঞ রাজনীতিক, সাবেক সফল মন্ত্রী, সমাজ সংস্কারক, শিক্ষা-সংস্কৃতি প্রেমী ও লেখকস্নেহে পূর্ণ মানুষ। আমি গর্বিত, তাঁর মতো মহান মানুষের সান্নিধ্য পেয়েছি, ভালোবাসা পেয়েছি এবং তাঁর হাত থেকে জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দুটি পুরস্কার গ্রহণের সৌভাগ্য অর্জন করেছি।
স্মৃতির পাতায় প্রথম স্বর্ণাক্ষর:
১৯৯৪ সালের মার্চ মাস। লালদীঘির ময়দানে বৃহত্তর চট্টগ্রাম উন্নয়ন সংগ্রাম কমিটির আয়োজনে মাসব্যাপী স্বাধীনতার রজতজয়ন্তী অনুষ্ঠান। হাজার হাজার মানুষের ভিড়, দেশের প্রতি ভালোবাসা ও চট্টগ্রাম উন্নয়নের স্বপ্নে আন্দোলনের উত্তাল পরিবেশ। সেই মঞ্চেই আমাকে “শ্রেষ্ঠ তরুণ সমাজকর্মী ও বক্তা” হিসেবে পুরস্কৃত করেন নোমান ভাই। তাঁর চোখেমুখে তখন ছিল আত্মবিশ্বাস, কণ্ঠে ছিল ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি—“তোমাদের মতো তরুণরাই আগামী দিনের ইতিহাস গড়বে।” এই বাক্যই আমার জন্য প্রেরণার মশাল হয়ে ওঠে।
দ্বিতীয় গৌরবময় মুহূর্ত: ২০১১ সালের নবীন সেন সাহিত্য পুরস্কার
২০১১ সালে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন সাংবাদিক ইউনিয়ন মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হলো ‘নবীন সেন সাহিত্য পুরস্কার’ প্রদান অনুষ্ঠান। প্রধান অতিথি ছিলেন নোমান ভাই। তিনি যখন আমার হাতে সাহিত্য পুরস্কার তুলে দিচ্ছিলেন, আমার চোখে তখন ভেসে উঠেছিল আমার দীর্ঘ লেখালেখির পথচলা, সংগ্রাম, স্বপ্ন ও সাধনার প্রতিটি অধ্যায়। পুরস্কার দেওয়ার পর তিনি যখন বললেন, “তুমি যেন আমার জীবনী লেখো”—তখন সে মুহূর্তটা আমার জীবনের চিরন্তন দায়িত্ব হয়ে ওঠে।
একজন সাহিত্যপ্রেমী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব
নোমান ভাই শুধু রাজনীতিক নন, ছিলেন একধারে সাহিত্য ও সংস্কৃতির এক নিবেদিতপ্রাণ যাত্রী। আমি বহুবার তাঁর সঙ্গে সাহিত্য, ইতিহাস ও সাংবাদিকতা নিয়ে কথা বলেছি। তিনি আমার লেখাগুলো নিয়মিত পড়তেন, মতামত দিতেন, সংশোধনের পরামর্শ দিতেন, উৎসাহ দিতেন নতুন চিন্তা করতে। আমি যখন বই “বাংলাদেশের নির্বাচন ও নির্বাচনি তথ্য-উপাত্ত” তাঁকে উপহার দিই, তিনি বইটি হাতে নিয়েই চোখ বুলিয়ে বলেছিলেন, “তোমার লেখার মধ্যে গবেষণা আছে, এটা সময়ের দাবি।” একজন মন্ত্রীর মুখে এমন প্রশংসা লেখক জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন।
আলজেরিয়া সফর ও তার মানবিক সহযোগিতা- ২০০১ সালে আমি যখন আলজেরিয়ায় বিশ্ব যুব সম্মেলনে অংশ নিতে যাচ্ছিলাম, তখন তিনি নিজে আমাকে ডেকে পাঠিয়ে বলেছিলেন, “তুমি দেশকে প্রতিনিধিত্ব করতে যাচ্ছো, আমি তোমার পাশে আছি।” এরপর আমাকে ১০০০ ডলার উপহার দেন এবং সবরকম সহযোগিতা করেন। তিনি রাজনীতির গণ্ডি ছাড়িয়ে ছিলেন একজন অভিভাবক, একজন সত্যিকারের বড় ভাই।
বেকারি শিল্পে পরিবর্তনের নায়ক নোমান ভাই-২০০৫ সালে চট্টগ্রাম বেকারি মালিক সমিতির সম্মেলনে তিনি প্রধান অতিথি ছিলেন। আমি তখন প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্বে। আমাদের বেকারি শিল্প তখন ধ্বংসের মুখে। শ্রমিক-মালিক দ্বন্দ্ব, মান নিয়ন্ত্রণহীনতা, প্রশাসনিক হয়রানি—সব মিলিয়ে কঠিন সময়। সেই সংকটে নোমান ভাই বলেছিলেন, “এই শিল্প বদলাতে হবে, এর জন্য আমি থাকবো।” তিনি মন্ত্রণালয় থেকে ব্যবস্থা গ্রহণ করেন, নীতিমালায় সংশোধন আনেন। আজকের আধুনিক ও উন্নত বেকারি শিল্পের পেছনে তাঁর এই সাহসী উদ্যোগ অবিস্মরণীয়।
আমার জন্য ব্যঙ্গ করে কেউ কেউ ‘বেকারি কামাল’ বললেও আমি গর্বিত—আমি ছিলাম পরিবর্তনের অগ্রনায়ক। শত শত কর্মচারী ছিল আমার অধীনে। যারা আমাকে নিয়ে ব্যঙ্গ করে, তারা নিজের ব্যর্থতা ঢাকতে গায়ে থুতু ছোড়ে। আমি তাঁদের করুণা করি।
বাংলা টিভি এবং উপস্থাপনাজীবনে নোমান ভাইয়ের উৎসাহ-২০১৮ সালে যখন আমি বাংলা টিভিতে “নির্বাচন ভাবনা” নামের টকশো উপস্থাপনা করছিলাম, সেখানে একাধিকবার নোমান ভাই অতিথি হয়ে এসেছেন। তাঁর উপস্থিতি মানে ছিল আলোচনা ঘনীভূত হওয়া। তিনি আমার উপস্থাপনা দেখে বলেছিলেন, “তুমি বলার ভঙ্গিমায় চট্টগ্রামের ভাষাও টেনে এনেছো—এটাই তোমার শক্তি।” একজন সিনিয়র রাজনীতিবিদের কাছ থেকে এমন প্রতিক্রিয়া পাওয়া একজন গণমাধ্যমকর্মীর জন্য অসাধারণ প্রাপ্তি।
তিনি ছিলেন ইতিহাসের প্রতিটি বাঁকে জড়িত- নোমান ভাই চট্টগ্রামের এমন কোনো উন্নয়ন নেই যেখানে তাঁর সুনিপুণ নেতৃত্ব নেই। ফ্লাইওভার হোক, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হোক, স্বাস্থ্যসেবা হোক কিংবা সাংস্কৃতিক আন্দোলন—সবখানেই তাঁর দৃষ্টি, পরিকল্পনা ও হাতের ছোঁয়া ছিল। আমি নিজে সাক্ষী, তাঁর একাধিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে উপস্থিত থেকেছি, অংশ নিয়েছি। তিনি রাজনীতির নামে শুধু ক্ষমতার খেলা খেলেননি—তিনি দেশ ও মাটি গড়ার কাজ করে গেছেন।
সমাপ্তি নয়, শুরু এক দায়বদ্ধতার
আজ নোমান ভাই নেই। কিন্তু আমি আছি তাঁর জীবনী লেখার দায়িত্ব নিয়ে। তিনি আমার কাঁধে যে দায়িত্ব দিয়ে গেছেন—“তুমি আমার জীবনী লেখো”—সেটা আমি পূরণ করবো ইনশাআল্লাহ। তাঁর কর্মকাণ্ড, সংগ্রাম, সাহিত্যপ্রেম, নেতৃত্বগুণ, বুদ্ধিমত্তা, বাগ্মিতা—সবকিছু নিয়ে আমি একটি পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ রচনার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি। আব্দুল্লাহ আল নোমান শুধু একজন ব্যক্তি ছিলেন না—তিনি ছিলেন এক বিস্ময়কর যাত্রার নাম। যাঁর সাহচর্যে আমার মতো একজন লেখক, সাংবাদিক ও সমাজকর্মী গড়ে উঠেছে। তিনি ছিলেন আলোকবর্তিকা, অনুপ্রেরণার উৎস, ইতিহাসের গর্বিত চরিত্র।
আজ তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে শুধু এটুকুই বলি—আপনি ছিলেন, আপনি আছেন, আপনি থাকবেন আমাদের চট্টগ্রামের আত্মায়, প্রতিটি ইট-পাথরে, প্রতিটি কথায়-লেখায়।
হে আল্লাহ, তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌস দান করুন।
আমিন।