
আওয়ামী রাজনীতি ও মুক্তিযুদ্ধের কিংবদন্তি নেতা চট্টগ্রামের এস এম ইউসুফ
মোহাম্মদ হাসান
মেধা, সাহস ও আদর্শের এক অনন্য রাজনৈতিক মহাকাব্য
ইতিহাসের কিছু মানুষ থাকেন, যাঁদের পরিচয় কোনো পদ-পদবি, ক্ষমতা কিংবা রাষ্ট্রীয় প্রটোকলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। তাঁদের জীবন হয়ে ওঠে একটি সময়ের দলিল, একটি প্রজন্মের প্রেরণা। চট্টগ্রামের রাজনৈতিক ইতিহাসে তেমনি এক উজ্জ্বল নাম জননেতা এস এম ইউসুফ।
তিনি ছিলেন মেধাবী ছাত্রনেতা, দক্ষ সংগঠক, মুক্তিযুদ্ধের সাহসী যোদ্ধা, বঙ্গবন্ধুর আদর্শের নিবেদিতপ্রাণ কর্মী এবং অসংখ্য রাজনৈতিক কর্মী তৈরির এক অনন্য কারিগর। ষাটের দশক থেকে নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত চট্টগ্রামসহ দেশের রাজনীতিতে তাঁর প্রভাব ছিল গভীর ও বিস্তৃত।
চট্টগ্রামের সিনিয়র সাংবাদিক নাসির উদ্দীন চৌধুরী তাঁর এক স্মৃতিচারণমূলক লেখায় যথার্থই উল্লেখ করেছেন—
“মধ্যষাট থেকে নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত তাঁর হাতে দীক্ষিত হয়েছেন অগণন মানুষ। কতজনের নাম বলবো, সবার নাম আমার জানাও নেই।”
এই একটি বাক্যই প্রমাণ করে, এস এম ইউসুফ শুধু একজন রাজনৈতিক নেতা ছিলেন না; তিনি ছিলেন একটি রাজনৈতিক শিক্ষালয়ের মতো, যেখানে বহু কর্মী আদর্শ, সংগঠন ও নেতৃত্বের শিক্ষা পেয়েছেন।
ছাত্ররাজনীতির উত্থান: চট্টগ্রাম কলেজ থেকে নেতৃত্বের সূচনা
এস এম ইউসুফের রাজনৈতিক জীবনের সূচনা ছাত্ররাজনীতির মধ্য দিয়ে। পটিয়ার হাবিলাসদ্বীপ উচ্চ বিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে তিনি ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরবর্তীতে চট্টগ্রাম কলেজে ভর্তি হওয়ার পর তাঁর রাজনৈতিক জীবনে আসে নতুন মোড়।
মেধা, সাংগঠনিক দক্ষতা ও নেতৃত্বের গুণে তিনি দ্রুত ছাত্রসমাজের নজরে আসেন। বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠন তাঁকে নিজেদের সঙ্গে যুক্ত করতে আগ্রহী ছিল। শেষ পর্যন্ত তিনি ছাত্রলীগের রাজনীতিতে যুক্ত হন। তৎকালীন ছাত্রলীগ নেতা কফিল উদ্দিনের মাধ্যমে তাঁর সক্রিয় ছাত্ররাজনীতির যাত্রা শুরু হয়।
১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন তাঁর রাজনৈতিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। শরীফ শিক্ষা কমিশনের রিপোর্টের বিরুদ্ধে আন্দোলনে অংশ নিয়ে তিনি প্রথমবারের মতো কারাবরণ করেন। কারামুক্তির পর চট্টগ্রামের ছাত্রসমাজ তাঁকে নতুন নেতৃত্ব হিসেবে গ্রহণ করে এবং তিনি চট্টগ্রাম কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতি নির্বাচিত হন।
ছাত্রলীগকে শক্তিশালী সংগঠনে রূপান্তরের কারিগর
ষাটের দশকের শুরুতে চট্টগ্রামে ছাত্র ইউনিয়নের সাংগঠনিক প্রভাব ছিল উল্লেখযোগ্য। সেই সময়ে এস এম ইউসুফ ছাত্রলীগকে একটি শক্তিশালী, জনপ্রিয় ও আদর্শভিত্তিক সংগঠনে পরিণত করার কাজে আত্মনিয়োগ করেন।
তিনি ছিলেন সার্বক্ষণিক সংগঠক। শহর থেকে গ্রাম—সবখানে ছাত্রসমাজের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ গড়ে তুলে তিনি ছাত্রলীগের সাংগঠনিক ভিত্তি শক্তিশালী করেন।
তাঁর বক্তৃতা ছিল নেতৃত্বের অন্যতম প্রধান শক্তি। ইতিহাস, সাহিত্য, দর্শন ও রাজনীতির গভীর জ্ঞান থেকে তিনি বক্তব্যে যুক্তি, আবেগ ও প্রেরণার সমন্বয় ঘটাতেন। তাঁর ভাষণ তরুণদের মধ্যে রাজনৈতিক চেতনা ও সংগ্রামের শক্তি সৃষ্টি করত।
কারাবরণ ও সংগ্রামের রাজনীতি
স্বাধিকার আন্দোলনের উত্তাল সময়ে এস এম ইউসুফ বারবার রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের শিকার হন। নাসির উদ্দীন চৌধুরীর লেখায় উল্লেখ রয়েছে, ১৯৬৭ সালে তাঁকে পুনরায় গ্রেফতার করা হয়। এক মাস পর মুক্তি পাওয়ার পর দেশরক্ষা আইনে জেলগেট থেকেই আবার তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় তিনি মুক্তি লাভ করেন।
এই সময়ের কারাজীবন তাঁর রাজনৈতিক দৃঢ়তাকে আরও শক্তিশালী করে। তিনি বিশ্বাস করতেন, সংগঠিত জনগণের শক্তিই রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রধান হাতিয়ার।
মুক্তিযুদ্ধের সাহসী সংগঠক
স্বাধীনতার পূর্ববর্তী সময়ে এস এম ইউসুফ ছিলেন বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের অন্যতম সক্রিয় সংগঠক। ছয় দফা আন্দোলন, গণআন্দোলন এবং স্বাধীনতার সংগ্রামে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি বৃহত্তর চট্টগ্রামে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠনে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। তিনি বিএলএফ (বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স)-এর অন্যতম সংগঠক হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
মুক্তিযুদ্ধ শুধু অস্ত্রের লড়াই ছিল না, ছিল সংগঠন ও মনোবলের লড়াইও। সেই জায়গায় এস এম ইউসুফের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
বঙ্গবন্ধুর আদর্শের প্রচারক
স্বাধীনতার পর আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে এস এম ইউসুফ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দর্শন ও রাষ্ট্রচিন্তা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে তিনি নিরলস কাজ করেন।
নাসির উদ্দীন চৌধুরীর লেখায় উল্লেখ করা হয়েছে, তিনিই প্রথম মুজিববাদ নিয়ে একটি বুকলেট প্রণয়ন করেন। বুক প্রমোশন থেকে প্রায় এক লাখ কপি ছাপিয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তা বিতরণ করা হয়। বঙ্গবন্ধু স্মারকগ্রন্থ সম্পাদনার সঙ্গেও তিনি যুক্ত ছিলেন।
১৯৭৩ সালে আমির হোসেনের সম্পাদনায় প্রকাশিত সাপ্তাহিক ‘পদক্ষেপ’-এর প্রকাশক ও মুদ্রক হিসেবেও তিনি দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৭৫-পরবর্তী অন্ধকার সময়ে প্রতিরোধের সংগঠক
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর আওয়ামী লীগ ভয়াবহ সংকটে পড়ে। এই কঠিন সময়ে এস এম ইউসুফ আত্মগোপনে থেকে দলীয় নেতা-কর্মীদের সংগঠিত করেন।
নাসির উদ্দীন চৌধুরীর ভাষায়, ‘শামীম ভাই’ ছদ্মনামে তিনি ঢাকা ও চট্টগ্রামে আওয়ামী লীগের র্যাঙ্ক অ্যান্ড ফাইলের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে কর্মীদের মনোবল ফিরিয়ে আনার জন্য যে সাংগঠনিক তৎপরতা চালিয়েছিলেন, তার তুলনা ছিল না।
চট্টগ্রামে মৌলভী সৈয়দ ও মহিউদ্দিন চৌধুরীর সঙ্গে তিনি বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদে প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন। ছাত্র-যুবকদের সংগঠিত করে প্রশিক্ষণের জন্য ভারতে পাঠানোর কাজেও তিনি যুক্ত ছিলেন বলে স্মৃতিচারণে উল্লেখ পাওয়া যায়।
পরবর্তীতে আওয়ামী লীগকে পুনর্গঠন ও পুনরুজ্জীবিত করার জন্য তিনি সারাদেশে ঘুরে বেড়ান। তাঁর এই সাংগঠনিক ভূমিকার স্বীকৃতি হিসেবে পরবর্তীতে তাঁকে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটিতে বিভাগীয় সম্পাদক পদে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
নেতা তৈরির কারিগর
এস এম ইউসুফের সবচেয়ে বড় অবদান ছিল নেতা তৈরি করা। তিনি ছিলেন একজন রাজনৈতিক শিক্ষক।
তাঁর সংস্পর্শে আসা বহু কর্মী পরবর্তীতে স্থানীয় ও জাতীয় রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠিত হন। তাঁর কাছে রাজনীতি ছিল শুধু ক্ষমতার পথ নয়; ছিল মানুষের অধিকার, আদর্শ ও সমাজ পরিবর্তনের মাধ্যম।
মূল্যায়নের আক্ষেপ
১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি পটিয়া আসন থেকে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। তাঁর জয়ের সম্ভাবনাও ছিল। কিন্তু নানা কারণে সেই জয় অধরা থেকে যায়।
নাসির উদ্দীন চৌধুরী লিখেছেন—
“আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের জন্য এস এম ইউসুফের অবদান অপরিমেয়। সে তুলনায় দলে তাঁর মূল্যায়ন হয়নি।”
জীবনের এক পর্যায়ে অভিমানাহত হয়ে তিনি রাজনীতি থেকে কিছুটা দূরে সরে যান। তবে আদর্শ ও সংগঠনের প্রতি তাঁর ভালোবাসা কখনো কমেনি।
সমাজ ও সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পৃক্ততা
রাজনীতির পাশাপাশি তিনি বিভিন্ন শিক্ষা ও সমাজকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি ঢাকাস্থ চট্টগ্রাম সমিতি ও পটিয়া সমিতির উপদেষ্টা কমিটির সদস্য, মনসা হাইস্কুল ও কলেজ পরিচালনা কমিটির সদস্য এবং হাবিলাসদ্বীপ হাইস্কুলের আজীবন সদস্য ছিলেন।
বই পড়া ও গান শোনা ছিল তাঁর অন্যতম প্রিয় বিষয়। জীবনের শেষ পর্যায়ে তিনি আধ্যাত্মিক চর্চার সঙ্গেও যুক্ত হন এবং কুতুবদিয়ার সাধক মালেক শাহের সান্নিধ্য লাভ করেন।
শেষ অধ্যায়
২০১৬ সালের ১৫ নভেম্বর ঢাকার একটি হাসপাতালে এস এম ইউসুফ শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। পরে পটিয়া উপজেলার মনসা গ্রামে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে সমাহিত করা হয়।
এস এম ইউসুফের জীবন ছিল সংগ্রাম, সাহস, ত্যাগ ও আদর্শের এক দীর্ঘ মহাকাব্য। তিনি ছিলেন অনলবর্ষী বক্তা, দক্ষ সংগঠক, মুক্তিযুদ্ধের সাহসী কর্মী এবং রাজনৈতিক চিন্তার এক নিবেদিত সাধক।
ক্ষমতার শীর্ষে না থেকেও যাঁরা ইতিহাসে নিজেদের স্থান করে নেন, এস এম ইউসুফ ছিলেন তাঁদেরই একজন। তাঁর কর্ম, চিন্তা ও রাজনৈতিক দর্শন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।
তথ্যসূত্র:
চট্টগ্রামের সিনিয়র সাংবাদিক নাসির উদ্দীন চৌধুরীর স্মৃতিচারণমূলক কলাম, চট্টগ্রাম খবর-এ তসলিম উদ্দিন রানার লেখা এবং দৈনিক প্রথম আলোর প্রতিবেদন।
লেখক:
মোহাম্মদ হাসান
সাংবাদিক ও কলামিস্ট।
![]()









